
শ্রীলংকা ক্রিকেট বোর্ডে পালাবদল, ‘ট্রান্সফরমেশন কমিটি’ গঠন
মে ২, ২০২৬
দায়িত্ব নিয়ে একটি খালও পুনরুদ্ধার করতে পারেনি দুই সিটি করপোরেশন
মে ২, ২০২৬আজ ১লা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস—শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সংগ্রাম ও অর্জনের দিন। ইতিহাসের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেওয়া হয়নি; বরং দীর্ঘ আন্দোলন, ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়েই তা অর্জিত হয়েছে। ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটের শ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ ছিল কঠিন ও সংগ্রামময়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
বর্তমানে দেশের শ্রমিকদের অবস্থান একদিকে যেমন অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে তাদের বাস্তব জীবনযাত্রা ও কর্মপরিবেশ এখনো অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। আইনগতভাবে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস স্বীকৃত হলেও বাস্তবে বহু শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। এর অন্যতম কারণ হলো দেশে এখনো কার্যকর জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর অভাব। ফলে শ্রমিকরা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হন, যা তাদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সম্প্রতি প্রণীত শ্রম আইন (সংশোধন) ২০২৬ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত সহজ করা, গৃহশ্রমিকদের স্বীকৃতি প্রদান, যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতার সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা এবং সেফটি কমিটি বাধ্যতামূলক করার মতো পদক্ষেপগুলো নিঃসন্দেহে অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এসব উদ্যোগ শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি করবে এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।
তবে আইনটির সীমাবদ্ধতাও কম নয়। একটি প্রতিষ্ঠানে ইউনিয়নের সংখ্যা সীমিত রাখা শ্রমিকদের সংগঠন স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া শ্রমিকের সংজ্ঞা সংকুচিত হওয়ায় অনেক কর্মচারী ও কর্মকর্তা আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাধ্যতামূলক প্রভিডেন্ট ফান্ড বাতিল হওয়াও শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক দিক। ফলে বলা যায়, আইনটি আংশিক অগ্রগতি হলেও শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে আরও ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শ্রম খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা। অতীতে তাজরীন ফ্যাশন, রানা প্লাজা, নিমতলী বা চকবাজারের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তদারকির অভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে। এসব ঘটনায় বহু শ্রমিক প্রাণ হারালেও বিচার ও ক্ষতিপূরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। নতুন আইনে কিছু সংশোধন আনা হলেও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও শাস্তির কঠোরতা যথেষ্ট নয়। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
আইন থাকলেই হবে না—তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য দ্রুত বিধিমালা প্রণয়ন, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের দাবি আদায়ে গণতান্ত্রিকভাবে সোচ্চার হতে পারেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শ্রমিকদের অধিকাংশ অধিকারই আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে; তাই সংগঠিত শক্তিই তাদের প্রধান ভরসা।
প্রতি বছর ঈদের আগে বেতন ও বোনাস নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা শ্রম খাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উন্নতি লক্ষ করা গেছে, তবুও এটি এখনো একটি কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। সরকারকে আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সময়মতো বেতন পরিশোধ নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শ্রমিকদের ওপর বলপ্রয়োগ বা দমননীতি কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়; বরং সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমেই টেকসই সমাধান সম্ভব।
আগামী বাজেট শ্রমিকবান্ধব হওয়া অত্যন্ত জরুরি। দেশের অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম হলেও বাজেটে তাদের জন্য বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হবে। শ্রম খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং সংকটকালীন সহায়তা তহবিল গঠন করা সময়ের দাবি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা দেখেছি, অনেক শ্রমিক হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য।
এছাড়া শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তাদের জীবনমান উন্নত হবে। একই সঙ্গে মালিকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, যাতে তারা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য হন।
সবশেষে বলা যায়, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো একদিনের কাজ নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ—এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। মে দিবস আমাদের শুধু অতীতের সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না, বরং ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কেও সচেতন করে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও মানবিক শ্রমব্যবস্থা গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


