
শ্রীলংকা ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশের অভ্যুত্থান যেখানে ভিন্ন
মে ৮, ২০২৬
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার ঐক্যবদ্ধ: আইনমন্ত্রী
মে ৮, ২০২৬বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতি শুধু একটি জনস্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতার নির্মম উদাহরণ। গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে হাম রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে—স্বাস্থ্য খাতে ভুল সিদ্ধান্ত কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই দুর্যোগ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য ছিল।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত সাফল্য অর্জন করেছিল। বিশেষ করে হাম টিকার আওতা বৃদ্ধিতে দেশটি স্বল্প আয়ের অনেক দেশের জন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু একটি কার্যকর ব্যবস্থাকে পরিকল্পনাহীনভাবে ভেঙে ফেলার ফলে সেই অর্জন আজ গভীর সংকটে পড়েছে। একটি সুসংগঠিত স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাতিল করার আগে বিকল্প কাঠামো নিশ্চিত করা ছিল সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, পরিকল্পনার অভাব, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতার কারণে পুরো ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি বন্ধ করার পর দীর্ঘ সময় কোনো কার্যকর বিকল্প চালু করা হয়নি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধের সংকট দেখা দেয়, জরুরি মজুদ ফুরিয়ে যায় এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর মধ্যেই টিকা সংগ্রহের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে উন্মুক্ত দরপত্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর খাতে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো, আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই কোনো টিকা পায়নি কিংবা মাত্র একটি ডোজ পেয়েছিল। অর্থাৎ তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফাঁকেই হারিয়ে গেছে। একই সময়ে কৃমিনাশক ও ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি বন্ধ থাকায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়।
এ ধরনের সংকটে শুধু প্রশাসনিক ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। “নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত না হওয়া” কিংবা “প্রশাসনিক জটিলতা” কোনোভাবেই শত শত শিশুমৃত্যুর গ্রহণযোগ্য কারণ হতে পারে না। স্বাস্থ্য খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ভুলের মূল্য মানুষের জীবন দিয়ে দিতে হয়। তাই এই ব্যর্থতাকে কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে স্বাস্থ্য খাতে নীতিগত পরিবর্তনের আগে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বিকল্প ব্যবস্থার নিশ্চয়তা অপরিহার্য। একটি কার্যকর কাঠামোকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সন্দেহের কারণে ভেঙে ফেলা কখনোই দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না।
এখন জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন, যারা পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করবে এবং দায়ীদের চিহ্নিত করবে। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচিকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা এবং স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিশুদের এই মৃত্যুগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বেদনাদায়ক স্মারক। যারা অবহেলা, ভুল সিদ্ধান্ত ও অদক্ষতার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দায়হীনতার সুযোগ নেই।
জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


