প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ব্যাগ পোশাক ও ফুটওয়্যার সামগ্রী বিতরণ করা হবে
মে ৮, ২০২৬
হাম দুর্যোগের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
মে ৮, ২০২৬
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ব্যাগ পোশাক ও ফুটওয়্যার সামগ্রী বিতরণ করা হবে
মে ৮, ২০২৬
হাম দুর্যোগের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
মে ৮, ২০২৬

শ্রীলংকা ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশের অভ্যুত্থান যেখানে ভিন্ন

দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রীলংকা, নেপাল ও বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও জনগণের হতাশা—এই চারটি উপাদান তিন দেশেই জনরোষের ভিত্তি তৈরি করেছিল। তবে অভ্যুত্থানের ধরন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সহিংসতার মাত্রা এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা শ্রীলংকা ও নেপালের তুলনায় স্পষ্টভাবে আলাদা ও ব্যতিক্রমী।

শ্রীলংকায় ২০২২ সালের ‘আরাগালায়া’ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে। জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধ সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলে রাজাপাকসে পরিবারের দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জনরোষ বিস্ফোরিত হয়। সেই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের নির্বাচনে আনূঢ়া কুমারা দিশানায়াকার নেতৃত্বাধীন জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে জনগণ নতুন নেতৃত্বের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়। এটি ছিল মূলত তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

নেপালের পরিস্থিতিও ছিল ভিন্নমাত্রিক। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল চলছিল। দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য তরুণ সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ‘নেপো-কিড’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জেনজি প্রজন্মের ক্ষোভ একসময় রাজপথে বিস্ফোরিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। তরুণরা ভিপিএনের মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলে। পরে বালেন শাহের মতো নতুন নেতৃত্বের উত্থান নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

তবে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান এই দুই দেশের তুলনায় অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী ও ঐতিহাসিকভাবে ভিন্ন। শ্রীলংকা ও নেপালে আন্দোলনের সময় সংঘর্ষ হলেও তা কখনো বাংলাদেশের মতো গণহত্যামূলক পরিস্থিতিতে পৌঁছেনি। বাংলাদেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ককে গভীর সংকটে ঠেলে দেয়। শিশু, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনে প্রাণ হারায়। দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধ ছাড়া রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো রাজনৈতিক বাস্তবতা। নেপাল ও শ্রীলংকায় আন্দোলন হয়েছিল নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে, কিন্তু বাংলাদেশে অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী ও বিতর্কিত নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। ফলে বাংলাদেশের আন্দোলন কেবল সরকারবিরোধী ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামো, নির্বাচন ব্যবস্থা ও শাসনব্যবস্থার বৈধতা পুনর্গঠনের আন্দোলন।

সংস্কার প্রশ্নেও বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। নেপাল ও শ্রীলংকার অন্তর্বর্তী সরকারগুলো সংস্কারের দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিলেও বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এসব কমিশনের সুপারিশ এবং জুলাই সনদের মাধ্যমে সংস্কারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে আইনি বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত।

নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পার্থক্য সুস্পষ্ট। শ্রীলংকা ও নেপালের জনগণ নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনলেও বাংলাদেশের জনগণ শেষ পর্যন্ত পুরনো ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দলের ওপরই আস্থা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানও লক্ষণীয়। বিশেষ করে এনসিপির সংসদে প্রবেশ এবং জামায়াতের আসন বৃদ্ধি দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করে।

সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার এই তিনটি গণ-অভ্যুত্থান জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হলেও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষয়ী, জটিল ও কাঠামোগত পরিবর্তনমুখী। এখন দেখার বিষয়, নতুন নেতৃত্বনির্ভর রাজনীতি নাকি অভিজ্ঞ রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব—কোনটি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়। ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক গতিপথ অনেকাংশেই এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করবে।

জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *