
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে ক্ষুব্ধ হয়ে হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধের ঘোষণা ইরানের
এপ্রিল ১৮, ২০২৬
বাড্ডায় যুবকের মরদেহ উদ্ধার
এপ্রিল ১৮, ২০২৬রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার কবরকে ‘শরিয়ত পরিপন্থী’ দাবি করে ‘ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির’ ও ‘তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে কর্মসূচি পালন করছিলেন মুসল্লিরা।
ওই কর্মসূচি চলার মধ্যেই হঠাৎ একদল লোক কবর থেকে নুরাল পাগলার মরদেহ তুলে মহাসড়কের ওপর পুড়িয়ে দেয়। যেখানে স্থানীয়রা অনেকটাই উৎসুক জনতার ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরে ওই সংঘর্ষের ঘটনায় আহত একজনের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুও হয়। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আব্দুর রহমান ওরফে শামীম পীরের দরবারে হামলার ক্ষেত্রেও একই রকম চিত্র দেখা যায়। সেখানেও স্থানীয়রা কেবল উৎসুক জনতার ভূমিকায় ছিলেন। মাঝ থেকে একদল লোক স্বল্প সময়ের মধ্যেই দরবারে লুটপাট এবং শামীমকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে।
শুধু এ দুটি মাজার নয়, একই ধরনের চিত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলার অন্যান্য ঘটনাতেও দেখা যায়; যেখানে একটি সংগঠিত গোষ্ঠী হামলা, নৃশংসতা ও লুটপাটে মূল ভূমিকা পালন করে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাজারে হামলাগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করলে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ করা যায়। তাদের মতে, এসব ঘটনায় প্রথমে একটি মব তৈরি হয়। তবে সেই ভিড়ের আড়ালে সংগঠিত একটি গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে, যারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়ে স্থান ত্যাগ করে। ঘটনার ধরন, দ্রুততা ও সমন্বয়ের দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, এ ধরনের হামলায় কেবল স্বতঃস্ফূর্ত জনতার অংশগ্রহণ নয়, বরং প্রশিক্ষিত গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে গত ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশের ৬৫টি স্থানে মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে ৬৭টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ হামলার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। বিভাগটিতে ২৫ বার মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৫টি, ময়মনসিংহে আট, খুলনায় চার, রাজশাহী ও রংপুরে তিনটি করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে সিলেটে ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন এলাকায় দুইবার মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন, খুলনা মেট্রোপলিটন, সিলেট মেট্রোপলিটন, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এবং বরিশাল রেঞ্জে একবার করে মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। মাজারে হামলার এসব ঘটনায় ২৬টি মামলা এবং ৪০টি সাধারণ ডায়েরি থানায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৬৭ জনকে। মামলাগুলোর মধ্যে নয়টিতে অভিযোগপত্র এবং ছয়টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এখনো মাজারে হামলার ১১টি মামলা তদন্তাধীন, যা মোট মামলার প্রায় ৪০ শতাংশ।
পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রূপগঞ্জ থানা এলাকার পূর্বাচল উপশহরের ১১ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত হোসেন আলী শাহ ওরফে লেংটার মাজারে হামলা হয় ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টার দিকে। অজ্ঞাতনামা পাঁচ শতাধিক লোক ওই হামলায় অংশ নেন। তবে তাদের মধ্য থেকে একটি গ্রুপ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাজারের ভেতরে প্রবেশ করে খানকা শরিফ, অতিথি ভবন, দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করে ৮০ লাখ টাকার ক্ষতি করে। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় মামলা হলেও সেটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। এ ঘটনার ঠিক পরদিন অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭টায় ত্রিশাল আমিরাবাড়ী ইউনিয়নের গোপালপুর বাবে বরকত দেওয়ানবাগ শরিফে সাত-আটশ অজ্ঞাত ব্যক্তি হামলা চালায়। এর মধ্যে একটি প্রশিক্ষিত গ্রুপ মাজারের গেট ভাংচুর করে। তারা ভেতরে ঢুকে লুটপাট করে ও অগ্নিসংযোগ ঘটায়। এ ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হলেও পরে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
mob-inside
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর বেলা ২টার পর কুমিল্লার হোমনা থানা এলাকায় মো. মহসিন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে হামলা চালানো হয়। হামলার সময় বহিরাগত লোকজন মহসিনের বাড়ি এবং বাড়িসংলগ্ন মাজারে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হলে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। এছাড়া গত বছরের ১৭ মার্চ বরগুনা জেলার আমতলী থানা এলাকায় হযরত ইসমাইল শাহের মাজারে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেদিন মাজারে বার্ষিক ওরস চলাকালে প্রায় ৪০০ মানুষ মিছিল করছিল। এর মধ্যেই একদল লোক বেলা ১টার দিকে মাজারে প্রবেশ করে ভাংচুর করে। দুটি টিনের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনায় মাজার কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন মাজারে হামলার ঘটনাগুলো পূর্বপরিকল্পিত। অনেক ক্ষেত্রে মাইকে ঘোষণা দিয়েও এ ধরনের হামলা চালানো হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যাচ্ছে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মাজারে হামলা ও লুটপাট করা হচ্ছে। প্রথম গ্রুপে স্থানীয় লোকজন অংশ নিচ্ছে। তার প্রতিবাদ জানানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকছে। কিন্তু দ্বিতীয় গ্রুপ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে মাজারে হামলা-ভাংচুর চালাচ্ছে। আর তৃতীয় গ্রুপটি মূলত লুটপাট চালাচ্ছে এবং হামলা করছে। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে হামলা ও লুটপাট চালিয়ে স্থান ত্যাগ করছে, যাতে বোঝা যায় এরা প্রশিক্ষিত। মূলত এ গ্রুপই সহিংসতার জন্য দায়ী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিজের মতো করে মতাদর্শ বা বিশ্বাস চর্চা করে এ ধরনের ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। এসব আক্রমণের যৌক্তিকতা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। অধিকাংশ সময়ে ভুক্তভোগী বা চারপাশের বাসিন্দাদের বক্তব্যে লক্ষ করা যায় ওই এলাকার বিশেষ কোনো ব্যক্তিদের স্বার্থের কারণেই তারা সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে এমন হামলা চালায়। এসব ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির ধরন দেখলে মনে হয় না কোনো সাধারণ মানুষের হামলার চিত্র এটি। মনে হয় খুব প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা এমন হামলা চালাচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাউকে মেরে ফেলার মতো কৌশলও তারা জানে। যেখানে আমরা গণতান্ত্রিক দেশে আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হতে চাই, সেখানে এ ধরনের উগ্রতা নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। যারা এমন কাজ করছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
দৌলতপুরে আব্দুর রহমান শামীম ওরফে শামীম পীরকে হত্যার ঘটনা পরিকল্পিত বলে মনে করেন স্থানীয়দের অনেকেই। তারা বলছেন, একটি পুরনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। যার জেরে সংঘবদ্ধভাবে দরবারে হামলা চালানো হয়।
এছাড়া এ সময় লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনায় নিহত পীরের ভাই যে মামলা করেছেন, সেখানে মাজারের সম্পদ ও স্বর্ণালংকার লুট হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন মামলার বাদী। হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ও মাজারের খাদেম জামিরন নেসাও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হামলার সময় একটি পক্ষ ভাংচুরের সঙ্গে লুটপাটেও অংশ নিয়েছিল।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে অনেক মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে আইডেন্টিফিকেশন বা শনাক্তকরণের কাজ চলছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ভিডিওগুলো ছড়িয়েছে সেগুলো কালেকশন (সংগ্রহ) করতে হচ্ছে। ওখান থেকে আমরা আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করছি।’
সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া ভিন্ন মতাদর্শীদের ওপর হামলা বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর উদাহরণ টেনে বলেন, ‘উনি বলেছিলেন কোনো সরকার না চাইলে বাংলায় কখনো দাঙ্গা সম্ভব নয়। সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই মাজারে হামলা বা মব বন্ধ করতে চায়, জিরো টলারেন্স নীতি নিলে তা অবশ্যই হওয়ার কথা। মাজারে হামলা হচ্ছে, মেয়েদের খেলাধুলার অনুষ্ঠানে হামলা হয়েছে, গানের অনুষ্ঠানে হামলা হচ্ছে—এগুলো কিন্তু হঠাৎ শুরু হয়নি। অনেক পুরনো। দক্ষিণাপন্থার উত্থানের ফলে এগুলো হচ্ছে। এটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
মাজারে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাজারে হামলার প্রতিটি ঘটনা পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আগামীতে মাজারে হামলার মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী মাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে।’


