
প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন
মার্চ ২৭, ২০২৬
শিরোনাম: দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ প্রশস্ত হোক
মার্চ ২৭, ২০২৬২৬ মার্চ—স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক অর্জনের স্মারক নয়, বরং একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির প্রতীক। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা আমাদের সামনে যে স্বপ্ন তুলে ধরেছিল, তা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমতাভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের হয়েছে, নাকি কেবল শাসকের পরিবর্তন ঘটেছে?
স্বাধীনতার মূল চেতনায় ছিল শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া, সম্পদের বণ্টন এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে জনগণের প্রত্যক্ষ প্রভাব খুবই সীমিত। ফলে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
রাজনৈতিক দলগুলোতেও গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি স্পষ্ট। দলীয় কাঠামোতে পরিবারতন্ত্র, আনুগত্যনির্ভর রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে নতুন নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে করে রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠীর আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে, যা সামগ্রিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের পথে বড় বাধা।
ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, এই সংকট নতুন নয়। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত রাষ্ট্র কাঠামো মূলত শোষণকেন্দ্রিক ছিল। স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই কাঠামো ভেঙে নতুন একটি জনমুখী রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ তৈরি হলেও, বহু ক্ষেত্রে পুরনো ধারা অব্যাহত থেকেছে। ফলে ক্ষমতা ও সম্পদের সুষম বণ্টনের পরিবর্তে তা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণআন্দোলন ও জনঅভ্যুত্থান এ সংকটকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এগুলো জনগণের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। তবে এ ধরনের আন্দোলনের পরও কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। এতে করে পরিবর্তনের আশা বারবার সৃষ্টি হলেও তা পূর্ণতা পায় না।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্র সংস্কার, যা কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নৈতিক ভিত্তির পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়ভিত্তিক নীতিনির্ধারণ অপরিহার্য।
একই সঙ্গে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন ও সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক আন্দোলন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
স্বাধীনতা দিবসের এই মুহূর্তে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের গৌরব হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান দায়িত্ব হিসেবে দেখা। এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত অংশীদার মনে করবে এবং ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিক মর্যাদা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে।
অতএব, শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ও ভবিষ্যতের প্রধান লক্ষ্য।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


