সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও রয়েছে পতনের ঝুঁকি
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
বিএনপির যৌথ সভা শেষে রুহুল কবির রিজভী মূল্য সমন্বয়ের পরও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম অনেক কম
সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও রয়েছে পতনের ঝুঁকি
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
বিএনপির যৌথ সভা শেষে রুহুল কবির রিজভী মূল্য সমন্বয়ের পরও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম অনেক কম
সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সর্বোচ্চ রেকর্ডে নয়, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের রেকর্ডের পর দাম দ্রুত কমে আসে। ১৭ এপ্রিল ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে নেমেছিল।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেই। অথচ বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন—চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই পৌঁছেছে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ সংকটে চলতি মাসে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ ডলারে উঠলেও তা চলতি বছরের এপ্রিল কিংবা ২০০৮ সালের রেকর্ড দামের তুলনায় অনেক কম। অতীতের বড় বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সংকটের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম রেকর্ড বা রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছার পর দেশে বড় মূল্য সমন্বয় করা হয়েছিল। এবার বিশ্ববাজার সেই পর্যায়ে না উঠতেই সরকার চার ধরনের জ্বালানির দাম একসঙ্গে লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর তিন দফায় মূল্য সমন্বয়ের পর ডিজেলের দাম মোট ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩, পেট্রল ৪৪ ও অকটেন ৪৫ টাকা বেড়েছে। এপ্রিলের আগের দামের তুলনায় এখন এসব জ্বালানির মূল্য প্রায় ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশ বেশি।
সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গতকাল থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ ও অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। শতাংশের হিসাবে ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪, কেরোসিন ১৪ দশমিক ৮, পেট্রল ১৪ দশমিক ৩ ও অকটেন ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
দেশে যখন এ মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল না। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগের কারণে চলতি মাসের মাঝামাঝি ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারের দিকে উঠেছিল। তবে ১৮ সেপ্টেম্বর আবার কমে ১০৪ ডলারে নামে। এমনকি গতকাল রাত ৯টার দিকে ব্যারেলপ্রতি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৯৯ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সর্বোচ্চ রেকর্ডে না থাকলেও দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনে দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে চার পণ্যের খুচরা মূল্যই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এ বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২০০৮ বা ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মতো নয়। তবে চার ধরনের জ্বালানির দাম একসঙ্গে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর বিষয়টি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এখানে বিপিসির আর্থিক চাপ ও সরকারের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার বিবেচনায়, একবারে সব ধরনের জ্বালানির দাম একই পরিমাণে না বাড়িয়ে আরো পরিমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক পদ্ধতি নেয়া যেত।’
ডিজেল বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় সব খাতকে প্রভাবিত করে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দেশে মোট পেট্রোলিয়াম পণ্য ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশই ডিজেল। এর বড় অংশ পরিবহন, কৃষি ও অন্যান্য উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রভাব শুধু পরিবহন ভাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, শিল্পের উৎপাদন ও বিপণন ব্যয়ের মধ্য দিয়ে তা পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আপাতত ডিজেল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রেখে পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সমন্বয় করা যেত। আবার ভর্তুকি কমানোর প্রয়োজন থাকলে সেটিও ধাপে ধাপে করা সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে জ্বালানির ওপর বিদ্যমান কর ও শুল্ক কাঠামো সাময়িকভাবে যৌক্তিকীকরণের সুযোগ আছে কিনা সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।’
পাঁচ মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি ছিল আরো সংকটপূর্ণ। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক সরবরাহযোগ্য অপরিশোধিত ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি রেকর্ড ১৪৪ দশমিক ৪২ ডলারে ওঠে। ওই মাসেই ফিউচার মার্কেটে ব্রেন্টের দামও ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে যে চড়া মূল্য দেখা গেছে, তা এপ্রিলের রেকর্ড মূল্যের অনেক নিচে।
তবে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে এতদিন দেশে দাম বাড়ানো হয়নি। এছাড়া দেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেল পাচার রোধ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং বিপিসির লোকসান কমাতে দাম সমন্বয় করা হয়।
চলতি বছর এপ্রিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ডে ওঠার সময় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম ছিল লিটারে ১০০ টাকা এবং কেরোসিন ১১২, পেট্রল ১১৬ ও অকটেন ১২০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে রেকর্ড দামের মধ্যেও সরকার তখন দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল। পরে ১৮ এপ্রিল দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেল ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০, পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ ও অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা করা হয়।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে ওঠার পরও এপ্রিলে দেশে পণ্যভেদে লিটারে ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। বিপরীতে চলতি মাসের মাঝামাঝি ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলার পর্যন্ত উঠলেও পরে তা ১০০ ডলারে নেমে আসে। বিশ্ব বাজার এপ্রিলের চূড়ার অনেক নিচে থাকা অবস্থাতেই ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম একসঙ্গে লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ডে না উঠলেও দেশে মূল্যবৃদ্ধির অংক তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের রেকর্ডের পর দাম দ্রুত কমে আসে। ১৭ এপ্রিল ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে নেমেছিল। এরপর জুনে দেশে দ্বিতীয় দফায় আবার মূল্য সমন্বয় করা হয়। ডিজেল লিটারে ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হলেও কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম আরো ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এতে কেরোসিন ১৩৫, পেট্রল ১৪০ ও অকটেন ১৪৫ টাকায় পৌঁছায়। সরকার তখন জানায়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে এ দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়।
সেপ্টেম্বরে এসে তৃতীয় দফায় চার ধরনের জ্বালানির দাম বাড়ানো হলো। ফলে এপ্রিলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ডে ওঠার সময় যে ডিজেল ১০০ টাকা ছিল, সেটি এখন ১৩৫ টাকা। কেরোসিন ১১২ থেকে ১৫৫, পেট্রল ১১৬ থেকে ১৬০ ও অকটেন ১২০ থেকে ১৬৫ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ এপ্রিলের আগের দামের তুলনায় ডিজেল ৩৫, কেরোসিন ৪৩, পেট্রল ৪৪ ও অকটেন ৪৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশ অঞ্চলের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক ধাক্কায় এত বেশি দাম বাড়ানো সরকার চাইলেই এড়াতে পারত। একবারে বড় অংকের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ে। এর সামগ্রিক প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে এবং জনজীবনের ওপর চাপ তীব্র হবে।’ আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে দেশীয় দাম নিয়মিত সমন্বয়ের সুযোগ সরকারের ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় দাম আটকে রেখে হঠাৎ বড় আকারে বাড়ানোর পরিবর্তে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে সমন্বয় করা হলে অর্থনীতিতে এমন আকস্মিক অভিঘাত সৃষ্টি হতো না।’
এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ৭ মার্চ ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩৯ দশমিক ১৩ ডলারে পৌঁছেছিল, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ ছিল। সে সময় বাংলাদেশে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ছিল লিটারে ৮০ টাকা, পেট্রল ৮৬ ও অকটেন ৮৯ টাকা। তেলের দাম সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠার পাঁচ মাস পর ২০২২ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশে এক দফায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ হারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৮০ থেকে ১১৪ টাকা, পেট্রল ৮৬ থেকে ১৩০ ও অকটেন ৮৯ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম একবারে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ, পেট্রল ৫১ দশমিক ১ ও অকটেন ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছিল। এটিই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এককালীন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি।
রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পর তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের (পরিশোধিত) দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৭০ ডলারে উঠলেও সরকার দাম বাড়ায়নি। পরিস্থিতি কিছু স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়। এর সঙ্গে ডলারের দামও বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ে। বিপিসির তহবিল শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে সরকার বাধ্য হয়ে দাম বাড়িয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন। উচ্চ মূল্যের পাশাপাশি ডলারের দরবৃদ্ধিকেও বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু পরে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করায় বিপিসির লোকসান আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন কর ও ভ্যাট কমিয়ে চাপ সামাল দেয়ার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল। তবে সরকার সে পথে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত জ্বালানির খুচরা মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২২ সালের বড় জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উচ্চ মূল্যের পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার দ্রুত অবমূল্যায়নও আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ এপ্রিল আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা ২০ পয়সা। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা বেড়ে ১০২ টাকা ৭ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ পাঁচ মাসেরও কম সময়ে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছিল প্রায় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানিতে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বেশি টাকা গুনতে হচ্ছিল বিপিসিকে। বর্তমানে দেশে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থায় রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল। ২০২২ সালের মতো দ্রুত মুদ্রা অবমূল্যায়নের ধাক্কা বর্তমানে নেই।
আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম ও ডলারের বিনিময় হার ছাড়াও দেশে জ্বালানির খুচরা মূল্যে আরো বেশ কয়েক ধরনের ব্যয় যুক্ত হয়। স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের কাঠামো অনুযায়ী পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য বা আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে আমদানি শুল্ক, অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাট যোগ হয়। এর বাইরে জাহাজ ভাড়া, বীমা ও সরবরাহকারীর মার্জিন মিলে প্রিমিয়াম; বন্দরে খালাস, সংরক্ষণ, হ্যান্ডলিং, এলসি কমিশন ও পরিবহন ক্ষতির মতো পরিচালন ব্যয়; প্রশাসনিক, আর্থিক ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়; বিপিসির মার্জিন এবং দেশের ভেতরে পরিবহন ও বিতরণ ব্যয়ও চূড়ান্ত দামের অংশ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিভিন্ন বিশ্লেষণে জ্বালানি তেলের মূল্য কাঠামোর স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও ডলারের বিনিময় হারের বাইরে জ্বালানির চূড়ান্ত মূল্যে বিভিন্ন কর, বিপিসির মার্জিন, পরিচালন ব্যয়, পরিবহন, বিতরণ ব্যয়সহ একাধিক উপাদান যুক্ত হয়। এসব ব্যয়ের কিছু অংশ কতটা যৌক্তিক এবং কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সিপিডির বিশ্লেষণে জ্বালানি লিকেজ ও পরিচালন অদক্ষতার ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়া, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বল নজরদারি, বিতরণ পর্যায়ে অনিয়মের ঝুঁকির কথাও বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। সংস্থাটির মতে, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণ পর্যায়ে জ্বালানির অপচয় বা লিকেজ এবং অন্যান্য পরিচালন অদক্ষতা আলাদাভাবে শনাক্ত ও পরিমাপ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে বড় জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের আরেকটি নজির রয়েছে ২০০৮ সালে। ওই বছরের জুন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছিল। জুলাইয়ে মার্কিন মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটে (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বকালের রেকর্ড ১৪৭ দশমিক ২৭ ডলারে পৌঁছায়, ব্রেন্ড ক্রুডের দাম ছিল ১৪৭ দশমিক ৫ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে এ ঊর্ধ্বগতি চলার মধ্যেই বাংলাদেশে বড় মূল্য সমন্বয় করা হয়। জুলাইয়ের শুরুতে ডিজেল ও কেরোসিন ৪০ থেকে ৫৫ টাকা, পেট্রল ৬৫ থেকে ৮৭ ও অকটেন ৬৭ থেকে ৯০ টাকা করা হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমে এলে অক্টোবরে বাংলাদেশেও দাম কমানো হয়। তখন ডিজেল ও কেরোসিন ৫৫ থেকে ৪৮ টাকা, পেট্রল ৮৭ থেকে ৭৮ ও অকটেন ৯০ থেকে ৮০ টাকা করা হয়েছিল। অতীতের বড় মূল্য সমন্বয়ের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড বা রেকর্ডের কাছাকাছি ছিল। এবার বিশ্ববাজার সেই পর্যায়ে না থাকলেও বাংলাদেশে ভোক্তা পর্যায়ে চার ধরনের জ্বালানির দামই ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘উপায়হীন না হলে এ অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না। মধ্যপ্রাচ্য সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ছে, জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। এ মুহূর্তে মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প ছিল না।’ প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান করতে হয়েছে। ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সামাজিক নিরাপত্তার কার্যক্রম ভীষণভাবে বিঘ্নিত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *