
চলতি বছর ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু, সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
জৌকুড়া-নাজিরগঞ্জ নৌ-রুট ৩ দিন ধরে বন্ধ ফেরি চলাচল
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬জেলাভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে সিলেটে ৬৪ ও সুনামগঞ্জে ৫৯ জনের। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৫৭ রোগী চিকিৎসাধীন।
সিলেট বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু, যাদের ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। একই সঙ্গে আক্রান্তদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ও গর্ভবতী নারীও রয়েছেন। টিকাদানে অনীহা, হাম সম্পর্কে অসচেতনতা ও আর্থসামাজিক সীমাবদ্ধতাকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের এক গবেষণা।
গতকাল স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সিলেট বিভাগে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম এবং রুবেলায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৯। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০ জন আর সন্দেহভাজন হামের উপসর্গ নিয়ে ১৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলাভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে সিলেটে ৬৪ ও সুনামগঞ্জে ৫৯ জনের। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৫৭ রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১৪৬ জন।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. তুহিন বড়ুয়া তমালের তত্ত্বাবধানে ২০০ আক্রান্ত রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়। এতে দেখা গেছে, আক্রান্তদের ৫২ দশমিক ৩ শতাংশের বয়স এক বছরের নিচে এবং ১৩ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ ও ৬০ থেকে ১২০ মাস বয়সী ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। আক্রান্ত শিশুদের গড় বয়স ৩১ দশমিক ৭ মাস। রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৬১ ও নারী ৩৯ শতাংশ।
টিকাদানের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। গবেষণায় অংশ নেয়া মায়েদের মাত্র ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ সম্পূর্ণ টিকা নিয়েছেন। কোনো টিকা না নেয়ার সংখ্যাও একই পরিমাণ। শিশুদের ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ হামের কোনো টিকা পায়নি। দুই ডোজ পূর্ণ করেছে মাত্র ৯ শতাংশ।
আক্রান্তদের ১০০ শতাংশের জ্বর ছিল। এছাড়া র্যাশ, কাশি, কপলিক স্পটস, কনজাঙ্কটিভাইটিস, সর্দি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা গেছে। আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই কম ওজন বা পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল।
আবাসস্থলের হিসাবে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী গ্রামীণ এবং ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শহরাঞ্চলের। আক্রান্তদের ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ সিলেট জেলার বাসিন্দা। মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জেও রোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত অর্ধেক পরিবারের অভিভাবকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। অধিকাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১০-১২ হাজার টাকা।
ডা. তুহিন বড়ুয়া তমাল বলেন, ‘অসচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ঘাটতিই শিশু ও নারীদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ মানুষ হাম সম্পর্কে জানে না। প্রায় একই সংখ্যক মানুষের ধারণা, টিকার মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ করা যায় না। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের টিকা না দেয়ার প্রধান কারণ অসচেতনতা।’
সিলেটের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোনাজ্জির আলী বলেন, ‘আঞ্চলিক পর্যায়ে হামের বিস্তার ঠেকাতে চিকিৎসকদের সঠিক গাইডলাইন অনুসরণ এবং মাঠপর্যায়ে দ্রুত রোগী শনাক্তকরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন মোল্লা গতকাল শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী নয় মাসের কম বয়সী আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশে হামের বি৩ ও বি৮—দুটি সক্রিয় স্ট্রেইন শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বি৩ অত্যন্ত সংক্রামক। সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন।’
বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব এখনো ঊর্ধ্বমুখী জানিয়ে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘দুই-তিন মাস বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার পেছনে তাদের মায়েদের শৈশবে যথাযথ টিকা না পাওয়ার বিষয়টিও ভূমিকা রাখছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমডি রেসিডেন্টদের মাধ্যমে শিগগিরই বিভাগজুড়ে একটি বিস্তৃত সমীক্ষা পরিচালনা করা হবে।’


