
খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতালকে ‘বিশেষায়িত’ ঘোষণা
জুলাই ১২, ২০২৬১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
জুলাই ১২, ২০২৬টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আমন ধানের জন্য রোপণ করা অন্তত ২ হাজার হেক্টর বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে।
এছাড়া আক্রান্ত হয়েছে আরো ১৫ হাজার হেক্টর আউশ ধানের জমি। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, আক্রান্ত হওয়া মানেই পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নয়। বৃষ্টি কমলে এবং পানি নেমে গেলে বীজতলা ও ধান রক্ষা পেতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, যে পরিমাণ জমিতে ধান চাষ করা হয় তার ২০ ভাগের এক ভাগ জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হয়। সে হিসাবে ২ হাজার হেক্টর বীজতলার চারা দিয়ে ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ সম্ভব।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আক্রান্ত বীজতলার পানি দ্রুত না নামলে সেটি পচে যাবে। ফলে সময়মতো কৃষকরা আমনের চারা জমিতে রোপণ করতে পাবেন না। আবার অতিবৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরো বীজতলা আক্রান্ত হতে পারে। এতে ধান উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে। এতে খাদ্যনিরাপত্তায়ও প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত অতিবৃষ্টি এবং উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যায় দেশের ১২টি জেলার ফসল আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত ফসলি জমির পরিমাণ ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টর। এর মধ্যে আমন ধানের বীজতলা রয়েছে ২ হাজার হেক্টর। আর ১৫ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান আক্রান্ত হয়েছে। একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি আমনের বীজতলা ও আউশ ধানের জমি আক্রান্ত হয়েছে। জেলাটিতে ৫৫০ হেক্টর জমির বীজতলা ও সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমির ধান আক্রান্ত হয়েছে। সেখানকার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় সেগুলো নষ্ট হওয়ার শঙ্কাই বেশি বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১২টি জেলায় অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং তার দ্বারা সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির জন্য বিভিন্ন ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ধান, রোপা আমন বীজতলা, বিভিন্ন ধরনের গ্রীষ্মকালীন সবজি, ফলের বাগান এবং পানের বরজ রয়েছে। আক্রান্ত জমির মধ্যে কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা এখন বোঝা যাবে না। ক্ষতি নিরূপণে সময় লাগবে।’
২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে রোপা আমন চাষের জমির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৭ লাখ ১০ হাজার ৭৬২ হেক্টর। আর ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৫৮ টন। আউশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৩৮৭ হেক্টর। ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ২১২ টন।
গত এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুর দিকের আকস্মিক বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে দেশের হাওরাঞ্চলে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সে সময় ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চালের হিসাবে ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার টন। যদিও কৃষক ও বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি।
এর মধ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ফুড আউটলুক ও বৈশ্বিক খাদ্যবাজার নিয়ে জুনে প্রকাশিত তাদের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তা এবং কৃষকের লাভ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ধান-চাল উৎপাদন কমতে পারে বলে আভাস দিয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাসে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন দশমিক ৫ শতাংশ বা দুই লাখ টন কমতে পারে। একই সময়ে ধান, গম, ভুট্টা প্রভৃতি শস্য উৎপাদন কমতে পারে তিন লাখ টন বা দশমিক ৬২ শতাংশ।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আজ রোববারের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির তেমন সুখবর নেই। গতকাল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গতকাল সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। একই সময়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে এবং সুরমা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।
একই সময়ে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি বেড়ে কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমনের বীজতলার পানি দ্রুত নেমে গেলে তেমন ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হলেও সেটি পরে কিছুটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। তবে আবারো পানি বাড়লে কিংবা প্রতি বছরের মতো উত্তরাঞ্চলে এবারো বন্যা দেখা দিলে তখন আমনের সামগ্রিক ফলনে প্রভাব ফেলবে। সেজন্য এখনই প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শও তাদের।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমনের যেসব বীজতলা আক্রান্ত হয়েছে আর বৃষ্টি না হলে কৃষক সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। প্রয়োজনে তারা আবার বীজতলা করতে পারবেন। সেজন্য সরকারকে এখানে সহযোগিতা করতে হবে। তবে আউশ পেকে গেছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব না। এবার হাওরের বন্যায় বোরো ধানের বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন আউশ ও আমনেও কিছু ক্ষতি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ বছর ধান চাষ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন বছর উত্তরাঞ্চলের তিস্তা অববাহিকায়ও বড় বন্যা হয়েছে। সেখানে কিছুটা দেরিতে জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের দিকে গিয়ে বন্যা হয়। ফলে সেখানে বন্যা হলে আমনে একটা বড় প্রভাব ফেলে। সেজন্য উত্তরাঞ্চলে বন্যার কতটা ঝুঁকি রয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে খাদ্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপাতত খাদ্যনিরাপত্তায় বড় হুমকি নেই। তবে বন্যার স্থায়িত্ব বাড়লে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেজন্য আগাম প্রস্তুতি রাখতে হবে।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে সরকারি ডেটা নিয়ে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। সরকারের উচিত হবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং আগামীতে ক্ষতির আশঙ্কা কতটা রয়েছে তার সঠিক ডেটা মূল্যায়ন করা। এরপর সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন নানা ধরনের টেকনোলজি বের হয়েছে। বীজতলার জন্য ফ্লোটিং বেড জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সরকারিভাবে এটি কৃষকের মাঝে পৌঁছে দেয়া গেলে বন্যা মৌসুমে বীজতলার ক্ষতি এড়ানো যাবে। এছাড়া আর্লি মর্নিং সিস্টেমের মাধ্যমে কৃষকের কাছে দীর্ঘমেয়াদি বা ঋতুভিত্তিক পূর্বাভাস পৌঁছে দিতে হবে। এতে তারা দুর্যোগের বিষয়টি মাথায় রেখে আগে-পরে চাষ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে ক্ষতি কমানো সম্ভব।’
গতকাল কুমিল্লায় এক অনুষ্ঠানে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা করা হবে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তালিকা প্রণয়ন সম্পন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন ও কৃষি কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করতে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বন্যাকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও চাষীদের সঠিক তথ্য সংগ্রহে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে তালিকা প্রস্তুতের পর সরকার তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেবে।’


