ইরান ভালো আচরণ না করলে আবারো বোমাবর্ষণের হুমকি ট্রাম্পের
জুন ১৮, ২০২৬
কৃষিতে সেন্সর, এআই ও ড্রোন ব্যবহারে কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী
জুন ১৮, ২০২৬
ইরান ভালো আচরণ না করলে আবারো বোমাবর্ষণের হুমকি ট্রাম্পের
জুন ১৮, ২০২৬
কৃষিতে সেন্সর, এআই ও ড্রোন ব্যবহারে কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী
জুন ১৮, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর, কী আছে ১৪ দফা শর্তে

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বুধবার রাতে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে জি৭ সম্মেলন পরবর্তী এক নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান-সংক্রান্ত এ নথিতে স্বাক্ষর করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এতে স্বাক্ষর করেছেন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গতকাল দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির লিখিত বিবরণ প্রকাশ করেছে। এ চুক্তির লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটানো। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে যুক্তরাষ্ট্র আবারো সামরিক হামলা শুরু করতে পারে এবং ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। খবর রয়টার্স ও বিবিসি।

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বুধবার রাতে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে জি৭ সম্মেলন পরবর্তী এক নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান-সংক্রান্ত এ নথিতে স্বাক্ষর করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এতে স্বাক্ষর করেছেন।

ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ-এ অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে, তাহলে আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করব। আমি তা চাই না। আমি চাই তারা চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাক।’

একইসঙ্গে তিনি ইরানিদের ‘বুদ্ধিমান’ বলে অভিহিত করেন এবং জানান, আগামী ৬০ দিনে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও জ্বালানি তেলের দাম কমার আশা করছেন।

অন্যদিকে, ইরানের নেতারা ট্রাম্পের নতুন হুমকির জবাব না দিয়ে চুক্তিকে উদযাপন করেছেন। ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত চুক্তি হিসেবে এটিকে দেখা হচ্ছে।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের কালিবফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ‘সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি। দুইয়ের তুলনাই চলে না।’

চুক্তির আওতায় ইরানের জব্দ বা স্থগিত থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

১৪ দফার এই চুক্তিকে মূলত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ বলা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না। এছাড়া দেশটির ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে, যদিও এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বাধ্যতামূলক নয়।

কী আছে ১৪ দফায়—

প্রথম দফা: ‘সব ফ্রন্টে’ সংঘাতের অবসান

চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ ‘সব ফ্রন্টে’ সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন যে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ইরানের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিকে ভেস্তে দিতে পারে।

অন্যদিকে, তেহরান বারবার আশা জানিয়েছে যে যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বুধবার বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনো সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে তা হবে ‘এই সমঝোতার লঙ্ঘন’, আর এর প্রতিক্রিয়ায় ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে’।

চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, ‘এখন থেকে’ কোনো পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করবে না বা হুমকি দেবে না এবং লেবাননের ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করবে।

নথি অনুযায়ী, চূড়ান্ত এ চুক্তি সংঘাতের স্থায়ী ‘অবসান’ ঘটাবে।

তবে এই দফার নিয়ে ইসরায়েল কী প্রতিক্রিয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

দ্বিতীয় দফা: ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ পারস্পরিক সম্মান

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক টেলিফোন ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কাছে হুবহু পড়ে শোনানো চুক্তিটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে’ এবং একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে বিরত থাকবে।

চলতি বছরের শুরুতে, ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সহায়তা আসছে’।

তৃতীয় দফা: ৬০ দিনের সময়সীমা

চুক্তির তৃতীয় দফা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতায় পৌঁছানোর অঙ্গীকার করেছে। তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

চতুর্থ দফা: যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ প্রত্যাহার করবে

চতুর্থ দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে আরোপিত নৌ অবরোধ এবং ‘যেকোনো বিঘ্ন বা প্রতিবন্ধকতা’ অপসারণ শুরু করবে।

চুক্তি এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে এই অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে। এ সময়ে ইরানের বন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে, তা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নৌ চলাচলের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চল’ থেকে নিজেদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পঞ্চম দফা: হরমুজ প্রণালি

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ চালিয়ে কোনো ধরনের ফি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে।

নথিতে বলা হয়েছে, কারিগরি ও সামরিক ‘প্রতিবন্ধকতা’ দূর করা এবং মাইন অপসারণ কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে জাহাজ চলাচল ‘অবিলম্বে’ শুরু হবে।

এর আগে এক ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তারা বারবার স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে চলাচলের জন্য কোনো ধরনের ফি নেওয়া হবে না।

দীর্ঘমেয়াদে, ওমান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলে ইরান হরমুজ প্রণালি পরিচালনায় আরও বিস্তৃত একটি কাঠামোগত চুক্তির জন্য কাজ করবে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ষষ্ঠ দফা: ইরানের পুনর্গঠনের জন্য অর্থায়ন

সমঝোতা স্মারকের ষষ্ঠ দফায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ‘চূড়ান্ত ও পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করবে।

চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে এই তহবিলের কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদন দেবে। তবে তার মানে এটা না যে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অর্থায়ন করবে।

সপ্তম দফা: নিষেধাজ্ঞার অবসান

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের আওতায় থাকা নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলোও অন্তর্ভুক্ত।

তবে এই প্রক্রিয়ার সময়সূচি এখনো স্পষ্ট নয়।

নথিতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে এ বিষয়ে একটি সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। তবে উভয় পক্ষই বিষয়টি ‘অবিলম্বে’ অগ্রাধিকার দিয়ে পরবর্তী আলোচনায় বিবেচনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

অষ্টম দফা: পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার প্রতিশ্রুতি

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা অর্জন না করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি উভয় পক্ষ তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে একমত হয়েছে।

এই পদার্থ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি এখনো স্পষ্ট নয়। নথিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী আলোচনায় একটি প্রক্রিয়া ‘পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে’ হবে। তবে ন্যূনতম হিসেবে এটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে ‘ডাউনব্লেন্ড’, অর্থাৎ ইউরেনিয়ামের মান বা তীব্রতা হ্রাস করার ব্যবস্থা করা হবে।

নবম ও দশম দফা: স্থিতাবস্থা

এই দুটি দফায় বলা হয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনা না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখবে।

বাস্তবে এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। একই সময়ে তারা জ্বালানি তেল, পেট্রলিয়াম পণ্য রফতানি এবং সংশ্লিষ্ট সেবাসমূহ- যেমন ব্যাংকিং লেনদেন ও পরিবহনের জন্য ওয়েভার বা ছাড়পত্র জারি করবে।

একাদশ দফা: জব্দকৃত অর্থ

এই দফাটি আলোচনায় একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। নথির একাদশ দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ‘জব্দ বা আটকানো সব অর্থ সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে’, আর এর প্রক্রিয়া পরবর্তী আলোচনায় নির্ধারণ করা হবে।

চুক্তির শেষ কয়েকটি দফায় চুক্তি বাস্তবায়নের কাঠামো ও প্রক্রিয়া বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এমন একটি ‘ব্যবস্থা’ গঠন করবে, যা এমওইউ বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করবে। তবে বাস্তবে এটি কীভাবে কাজ করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এমওইউ স্বাক্ষরের পর এবং বাস্তবায়ন শুরু হলে উভয় দেশ চূড়ান্ত একটি চুক্তির জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে।

সবশেষে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *