ইরানে মার্কিন হামলার পর কুয়েত-বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল তেহরান
জুন ৭, ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু আজ
জুন ৭, ২০২৬
ইরানে মার্কিন হামলার পর কুয়েত-বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল তেহরান
জুন ৭, ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু আজ
জুন ৭, ২০২৬

স্টার্টআপ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা সম্পদের প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’

দেড় দশক আগে স্টার্টআপ কোম্পানি হিসেবে যাত্রা করেছিল মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’।

শুরুতে এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এ স্টার্টআপটি দেশের আর্থিক খাতের বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। গত বছর শেষে বিকাশের মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল ইকুইটির পরিমাণই ছিল ৪ হাজার ১৩১ কোটি টাকার বেশি।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়া বিকাশের গ্রাহক সংখ্যা এখন ৮ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে সক্রিয় গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি, যারা সর্বশেষ ৯০ দিনের মধ্যে লেনদেন করেছেন। বিপুল এ জনগোষ্ঠীকে সেবার বিপরীতে বড় অংকের মুনাফাও করেছে বিকাশ। কেবল ২০২৫ সালেই প্রতিষ্ঠানটির আয় (রেভিনিউ) ছিল ৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে গত বছর ৬৬১ কোটি টাকার নিট মুনাফা ঘরে তুলেছে বিকাশ।

ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশন এলএলসির যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিকাশ বড় অংকের বিদেশী বিনিয়োগও আকৃষ্ট করতে পেরেছে। গত কয়েক বছরে এমএফএস প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় যুক্ত হয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি), গেটস ফাউন্ডেশন, অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল ও জাপানের সফটব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিকাশ ৩৮১ মিলিয়ন বা ৩৮ কোটি ১০ লাখ ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টার্টআপ থেকে বিকাশের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি বড় অর্জন। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, বিনিয়োগ ও করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠানটিকে এ উচ্চতায় পৌঁছতে সহায়তা করেছে। তাদের এ সাফল্য দেশের অন্য উদ্যোক্তাদের জন্যও দৃষ্টান্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে পারাকে গৌরবের বলে মনে করেন ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী তারেক রেফাত উল্লাহ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ টাকা লেনদেন করতে ব্যাংকে যেতে ভয় পেতেন। একজন রিকশাচালকের পক্ষে ব্যাংকে গিয়ে স্বজনদের কাছে টাকা পাঠানোর উপায় ছিল না। আমরা চেয়েছিলাম, দেশের প্রতিটি মানুষ নিজের ঘরে বসে টাকার লেনদেন করুক। বিকাশ সে লক্ষ্য পূরণে দেশে নতুন একটি ধারা সৃষ্টি করেছে।’

তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘স্যার ফজলে হাসান আবেদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত সবক’টি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখা। ব্র্যাক ব্যাংকও এ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশের ব্যাংকগুলো আগে এসএমই খাতে ঋণ দিত না। তাই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকিং সেবা ও ঋণ পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। আর বিকাশ দেশের সব মানুষের ঘরে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিয়ে ভালো মুনাফাও পাচ্ছে। কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠানটির ভ্যালুয়েশন করা হয়েছিল। সে সময় এর বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছিল ১ বিলিয়ন ডলারে। এখন এর মূল্যমান ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে।’

কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে শেয়ারভিত্তিক বেসরকারি কোম্পানি হিসেবে ২০১০ সালের ১ মার্চ বিকাশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এমএফএস হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স ও অন্যান্য কার্যক্রম শেষে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১১ সালে। দ্রুত সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক পরিধি বিস্তৃত হলেও নিট মুনাফার দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে ছিল বিকাশ। তবে চার বছর ধরে আয় ও মুনাফার দিক থেকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। ২০২২ সালে মাত্র ১৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করা বিকাশ ২০২৩ সালে ৯৮ কোটি ও ২০২৪ সালে ৩১৬ কোটি টাকা মুনাফা করে। আর গত বছরের নিট মুনাফা রেকর্ড ৬৬১ কোটি টাকা। দেশের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেক ভালো ব্যাংকও এত টাকার নিট মুনাফা করতে পারেনি গত বছর।

বিকাশের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির আয় (রেভিনিউ) ছিল ৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। বিপরীতে সেবা দিতে গিয়ে ৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। সে হিসাবে বিকাশের গ্রস মুনাফা অর্জিত হয়েছে ২ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। এ মুনাফা থেকে ১ হাজার ৭১০ কোটি টাকা পরিচালন, প্রশাসন ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যয় হয়েছে। এসব ব্যয় ও কর পরিশোধ শেষে গত বছর বিকাশের নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৬৬১ কোটি টাকায়। গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থের বিপরীতে ই-মানি ইস্যু করে বিকাশ। গত বছর শেষে প্রতিষ্ঠানটির ইস্যুকৃত ই-মানির পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল শেষে বিকাশের মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ ১৬ হাজার ২২১ কোটি টাকা ছিল বলে আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিকাশ থেকে জানানো হয়, গত বছর শেষে বিকাশের ভেরিফায়েড রেজিস্টার্ড গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে ৪ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহক শেষ তিন মাসে লেনদেনের মাধ্যমে সক্রিয় ছিল। সাড়ে ৩ লাখের বেশি এজেন্ট পয়েন্ট ও প্রায় ১০ লাখ মার্চেন্ট পেমেন্টের মাধ্যমে দেশব্যাপী সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বিকাশের অ্যাপ ব্যবহার করে দেশের চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৬০ লাখের বেশি সঞ্চয়ী বা ডিপিএস হিসাব খোলা হয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাপ ব্যবহার করে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ডিজিটাল ঋণ বিতরণ করেছে সিটি ব্যাংক পিএলসি। প্রবাসী বাংলাদেশীরা বর্তমানে ১৭০টিরও বেশি দেশ থেকে ১৩৫টি আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অপারেটরের (এমটিও) মাধ্যমে যেকোনো সময় প্রিয়জনের বিকাশ অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন, যা দেশীয় ২৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে স্যাটলমেন্ট হচ্ছে।

বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে ২০০-এর বেশি সেবা দেয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) মঈনুদ্দিন মোহাম্মদ রাহগীর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিকাশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকারে। শুরু থেকে আমরা ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বা স্বল্প ব্যাংকিং সেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নিয়ে আসার লক্ষ্যে কাজ করছি। এ লক্ষ্য পূরণে আমরা সাফল্যের পথে হাঁটছি।’

মঈনুদ্দিন মোহাম্মদ রাহগীর বলেন, ‘বিকাশের গ্রাহকদের একটি বড় অংশই নিয়মিত ক্যাশবিহীন লেনদেন করছেন, যা সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসারে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডিজিটাল সেবার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ও মুনাফা—উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধির ধারাকে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশের ক্যাশবিহীন ও ডিজিটাল অর্থনীতির যাত্রার প্রধান সহযোগী হিসেবে বিকাশ ভবিষ্যতেও আর্থিক ইকোসিস্টেম, ডিজিটাল কমার্স এবং পেমেন্ট সলিউশন খাতকে আরো শক্তিশালী করতে বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রাখবে।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *