ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত আমরা নিয়ে নেব, ধ্বংস করব: ট্রাম্প
মে ২২, ২০২৬
টিকাদান কর্মসূচিতে বৈশ্বিক উদাসীনতা মানবতার জন্য হুমকি
মে ২২, ২০২৬
ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত আমরা নিয়ে নেব, ধ্বংস করব: ট্রাম্প
মে ২২, ২০২৬
টিকাদান কর্মসূচিতে বৈশ্বিক উদাসীনতা মানবতার জন্য হুমকি
মে ২২, ২০২৬

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

পৃথিবীর বয়স প্রায় পাঁচশ কোটি বছর। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে ধাপে ধাপে, আর মানুষ এসেছে অনেক পরে। কিন্তু বর্তমানে মানুষের কর্মকাণ্ডই পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান—গাছপালা, নদী, পাহাড়, বনভূমি, পশুপাখি ও জলবায়ু—পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে মানবসভ্যতার অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশে আজ সেই সংকটই ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে একসময় ছিল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। নদীমাতৃক এ দেশে ছিল অসংখ্য মাছ, পাখি ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ। বনভূমি ছিল নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বনভূমি উজাড়, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ শিকার, নদী দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। একসময় গ্রামের ভোর শুরু হতো পাখির কলকাকলিতে, নদীতে দেখা যেত শুশুকের খেলা, বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াত নানা প্রাণী। আজ সেসব অনেকটাই গল্পে পরিণত হয়েছে।

দেশে প্রতিনিয়ত বনভূমি কমছে। বন ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীরা হারাচ্ছে তাদের আবাসস্থল। চকরিয়া সুন্দরবনের মতো সমৃদ্ধ বনাঞ্চল এখন প্রায় বিলীন। সেখানে গড়ে উঠেছে চিংড়িঘের ও লবণ চাষের বিস্তার। অথচ একটি বনভূমি কেবল গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র। বন ধ্বংস হলে শুধু গাছই হারায় না, হারিয়ে যায় অসংখ্য প্রাণীর জীবনচক্রও। এর প্রভাব পড়ে পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর।

অতিথি পাখি হত্যাও আমাদের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। প্রতি শীত মৌসুমে হাজার হাজার অতিথি পাখি বাংলাদেশে আসে। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার বদলে তারা শিকারিদের হাতে প্রাণ হারায়। বাজারে প্রকাশ্যে এসব পাখি বিক্রি হয়। একইভাবে বনাঞ্চলে নির্বিচারে চলছে বন্যপ্রাণী শিকার। আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে সহজেই।

বাংলাদেশের নদীগুলোতে একসময় প্রচুর শুশুক দেখা যেত। এই নিরীহ প্রাণী এখন বিলুপ্তির পথে। জেলেদের জালে আটকে, নৌযানের ধাক্কায় কিংবা মানুষের নিষ্ঠুর আচরণে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে শুশুক ও ডলফিন। অনেক ক্ষেত্রে কুসংস্কারের কারণে মানুষ ডলফিন হত্যা করছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ বৃদ্ধি এবং মাছের সংকটও এদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। নদী রক্ষা ছাড়া এসব প্রাণী রক্ষা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক সংস্থা International Union for Conservation of Nature বা আইইউসিএনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে এখন বহু প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্তপ্রায়। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, এশিয়ান হাতি, ঘড়িয়াল, পাইথনসহ অসংখ্য প্রাণী অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। কয়েক বছর আগেও সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল বেশি, এখন তা কমে এসেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বনভূমি সংকুচিত হওয়া, খাদ্যের অভাব এবং মানুষের অনুপ্রবেশ এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দেশে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। পরিবেশ নীতি, বন সংরক্ষণ আইন, মৎস্য সংরক্ষণ আইনসহ নানা বিধিবিধান তৈরি করা হয়েছে। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানও বিভিন্ন প্রজাতি সংরক্ষণে কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইনের কার্যকর প্রয়োগের অভাব রয়েছে। কাগজে-কলমে আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়।

একসময় বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির ধান ছিল। এখন উচ্চফলনশীল জাতের আধিপত্যে দেশীয় বহু প্রজাতি হারিয়ে গেছে। অথচ স্থানীয় এসব ধানের পুষ্টিগুণ ও পরিবেশ সহনশীলতা ছিল অনেক বেশি। একইভাবে দেশীয় ফল, গাছ ও অন্যান্য কৃষিজ প্রজাতিও হারিয়ে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে স্থানীয় প্রজাতি সংরক্ষণে জোর দিতে হবে।

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রভাব কেবল প্রকৃতির ওপরই পড়ে না, এর প্রভাব পড়ে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতেও। মাছ কমে গেলে খাদ্য সংকট বাড়ে, বন কমে গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ে, পাখি ও কীটপতঙ্গ কমে গেলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

এই সংকট মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, বনভূমি রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নতুন করে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নদী ও জলাশয় দূষণমুক্ত রাখতে হবে এবং শুশুকসহ জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, স্থানীয় প্রজাতির ফসল ও উদ্ভিদ সংরক্ষণে গবেষণা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গণসচেতনতা বৃদ্ধি। মানুষকে বোঝাতে হবে যে প্রকৃতি ধ্বংস মানে নিজের অস্তিত্ব ধ্বংস করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার শিক্ষা দিতে হবে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ছাড়া মানবজাতির টিকে থাকা সম্ভব নয়। জীববৈচিত্র্য যত সংকুচিত হবে, মানুষের ভবিষ্যৎ তত অনিশ্চিত হবে। তাই এখনই সময় প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা একটি বিপর্যস্ত পৃথিবী উপহার দেব।

জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *