
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন
মে ২২, ২০২৬
অরক্ষিত রেললাইন
মে ২২, ২০২৬বিশ্ব রাজনীতিতে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে যত আলোচনা হয়, মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। টিকাদান কর্মসূচি তার অন্যতম। অথচ এটি এমন একটি জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ, যার মাধ্যমে গত কয়েক দশকে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে টিকাদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীনতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে।
টিকা মানবসভ্যতার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসাবিষয়ক আবিষ্কারগুলোর একটি। গুটি বসন্ত, পোলিও, হামসহ বহু প্রাণঘাতী রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে টিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য। গত অর্ধশতাব্দীতে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে ১৫ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে টিকার বিকল্প নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকাদানে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফলও অত্যন্ত বড়। কারণ একটি শিশুকে সুস্থ রাখার মাধ্যমে শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই কমে না, ভবিষ্যতে তার উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পায়।
তবুও আজ বিশ্ব এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি। টিকা নিয়ে গুজব, ভুল তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিভ্রান্তি মানুষের মধ্যে টিকা সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি করছে। উন্নত দেশগুলোতেও টিকাদানের হার কমে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তায় কাটছাঁটের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশগুলো। এসব অঞ্চলের লাখ লাখ শিশু এখনো কোনো ধরনের টিকার আওতায় আসতে পারেনি।
বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ শিশু রয়েছে যারা কখনো কোনো টিকা পায়নি। এদের বড় অংশ বাস করে সংঘাতপূর্ণ ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোতে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে এসব অঞ্চলে টিকাদান কার্যক্রম কার্যত থমকে আছে। ফলে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়ে যাচ্ছে। একটি শিশু যখন মৌলিক টিকা থেকেও বঞ্চিত হয়, তখন সে শুধু নিজেই ঝুঁকিতে থাকে না; পুরো সমাজের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
বিশ্বব্যাপী মহামারী ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও এ কারণে বাড়ছে। কারণ অধিকাংশ সংক্রামক রোগ এখন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকেই ছড়ায়। কোভিড-১৯ মহামারী আমাদের দেখিয়েছে, পৃথিবীর কোনো দেশই আলাদা নয়। একটি অঞ্চলের স্বাস্থ্যঝুঁকি খুব দ্রুতই বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই টিকাদানকে কেবল মানবিক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
এই সংকটের সমাধান অসম্ভব নয়। বরং অল্প খরচেই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেও শিশুদের কাছে টিকা পৌঁছে দেয়া যায়। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত উদ্যোগগুলো বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছে। কারণ স্থানীয় মানুষই এলাকার বাস্তবতা ভালো বোঝে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। যেখানে সরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার পৌঁছানো কঠিন, সেখানে স্থানীয় উদ্যোগ কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে Gavi, the Vaccine Alliance-এর মতো সংস্থাগুলো দরিদ্র ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে টিকাদান সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে লাখ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে এসব তহবিলও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে টিকাদান কর্মসূচি আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক নেতাদের এখন বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমত, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ টিকাদানে ব্যয় করা প্রতিটি অর্থ ভবিষ্যতে বহুগুণ সুফল এনে দেয়। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যে শিশু সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রয়েছে, তাকে টিকার আওতায় আনাই হওয়া উচিত বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতির মূল লক্ষ্য।
শুধু টিকার ডোজ সরবরাহ করলেই হবে না; প্রয়োজন শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা। দুর্গম অঞ্চলে টিকা পৌঁছাতে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। অনেক সময় যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তখন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও নাগরিক সংগঠনগুলোই শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। তাই এসব সংগঠনকে অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
টিকাদান কর্মসূচি কেবল স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয় নয়, এটি মানবাধিকারের প্রশ্নও। প্রতিটি শিশুর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। একটি শিশু যেন প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা না যায়, সেটি নিশ্চিত করা সভ্য বিশ্বের দায়িত্ব। অথচ সামান্য অর্থের অভাবে আজও বহু শিশু মৌলিক টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটি শুধু দুঃখজনক নয়, বৈশ্বিক বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই সফলতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি, স্বাস্থ্যখাতে সীমিত বাজেট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। তাই সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে যাতে মানুষ টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়।
সবশেষে বলা যায়, টিকাদানে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করা। বিশ্বনেতাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—অল্প ব্যয়ে কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করা অথবা উদাসীনতার কারণে ভবিষ্যতে বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়া। মানবতার স্বার্থে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


