ক্যালিফোর্নিয়ায় মসজিদে বন্দুক হামলায় নিহত ৩, হামলাকারীর আত্মহত্যা
মে ১৯, ২০২৬
জ্বালানি খাতে বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলার সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
মে ১৯, ২০২৬
ক্যালিফোর্নিয়ায় মসজিদে বন্দুক হামলায় নিহত ৩, হামলাকারীর আত্মহত্যা
মে ১৯, ২০২৬
জ্বালানি খাতে বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলার সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
মে ১৯, ২০২৬

১৫ মাসে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার অর্থ ও সম্পত্তি জব্দ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, আদালতের আদেশের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে মোট ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ২৩ লাখ টাকার অর্থ ও সম্পত্তি জব্দ, অবরুদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। জব্দকৃত সম্পদের মধ্যে ৩৮ হাজার ৫৯৭ শতাংশ জমির মূল্য ধরা হয়েছে ২ হাজার ২১৬ কোটি ১৪

লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। একই সময়ে ৪২১টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়, যেখানে রয়েছে ৩২৯ কোটি ২১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭২ টাকা। এছাড়া বাজেয়াপ্ত সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৩৫০ শতাংশ জমি, ২০টি ফ্ল্যাট, ১১টি কোম্পানির শেয়ার ও ২৩টি গাড়ি, যার মোট মূল্য ২৫ কোটি ৩২ হাজার ৬২৮ টাকা। পাশাপাশি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে চুরি হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে থাকা অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়।

সিআইডির জব্দ করা সম্পদের তালিকায় রয়েছে রাজধানীর গুলশানে সালমান এফ রহমানের পরিবারের একাধিক বিলাসবহুল আবাসনও। রাজধানীর গুলশান-২ সার্কেলের ৬৮/এ নম্বর সড়কের শেষ প্রান্তে ৩১ নম্বর বাড়ি ‘বসতি ট্রিপলেট’। একই বাউন্ডারির ভেতরে থাকা তিনটি ভবনের আবাসনে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের দুই ছেলে শায়ান ফজলুর রহমান ও আহমেদ শাহরিয়ার রহমানের ডুপ্লেক্স প্রিমিয়াম অ্যাপার্টমেন্ট। অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের মামলায় আদালতের নির্দেশে অ্যাপার্টমেন্টটি জব্দ করে ভাড়া দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতি মাসে সেখান থেকে ১ লাখ টাকা ভাড়া সংগ্রহ করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া হচ্ছে। পাশেই গুলশানের ৮৪ নম্বর সড়কে এ পরিবারের আরেকটি বিলাসবহুল ফ্লোরও জব্দ করা হয়েছে। তবে সেটির এখনো কোনো ভাড়াটিয়া পাওয়া যায়নি। ৬ হাজার ১৯০ বর্গফুটের ফ্লোরটি প্রায় দুই বছর ধরে তালাবদ্ধ।

এছাড়া পরিবারটির মালিকানাধীন ঢাকা জেলার দোহার এলাকায় মোট ১ হাজার ৯৬৮ শতাংশ জমি ও সেখানে নির্মিত স্থাপনাও আদালতের নির্দেশে জব্দ করেছে সিআইডি। বর্তমানে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে ঢাকার বিশেষ কারাগারে রয়েছেন সালমান এফ রহমান। গত বছরের শুরুতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ উপদেষ্টা ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি জব্দের মধ্য দিয়ে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ জব্দের কার্যক্রম শুরু করে সিআইডি।

এ বিষয়ে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের মামলায় সালমান এফ রহমান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের মালিকানাধীন গুলশানের দুটি অ্যাপার্টমেন্ট জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট মাসিক ১ লাখ টাকায় ভাড়া দেয়া হয়েছে। তবে ৮৪ নম্বর সড়কের অ্যাপার্টমেন্টটির এখনো ভাড়াটিয়া পাওয়া যায়নি। জব্দ করা সম্পদের ভাড়া নির্ধারণ করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। নির্ধারিত ভাড়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়া পাওয়া কঠিন হচ্ছে। তবে নীতিমালা অনুযায়ী জব্দ করা সব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।’

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে সিআইডি। সে সময় বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক হিসাব তলব করা হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর বেক্সিমকো গ্রুপ, গাজী গ্রুপ, রংধনু গ্রুপ, বিএসবি গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকা কয়েকজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়। পরবর্তী সময়ে অবৈধ অর্থে গড়া সম্পদ শনাক্ত করতে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রেজিস্ট্রি অফিস, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেয় সিআইডি। এসব প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা তথ্যপ্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে সম্পদ জব্দের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে বিভিন্ন সম্পদ জব্দ করা হয়।

গাজী গ্রুপের প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করে সিআইডি। গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর সম্পত্তির মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রায় পাঁচ হাজার শতাংশ জমি, গাজী টায়ারের কারখানা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা জব্দ করা হয়।

এর এক মাস পর ঢাকার বনানীতে রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন একটি হোটেল জব্দ এবং সমবায় ব্যাংকে থাকা তার ৩৪ কোটি টাকা অবরুদ্ধ করে সিআইডি। গুলশান থানায় দায়ের করা মানি লন্ডারিং মামলায় আদালতের নির্দেশে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। এর আগে ৭ আগস্ট রফিকুল ইসলাম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ৮৭৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করেছিল সংস্থাটি।

এছাড়া ইউনিক গ্রুপসহ আরো কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মামলা-পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, অবৈধ অর্থে গড়া সম্পদ শনাক্ত করে জব্দের আবেদন করা হবে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অনুসন্ধান চলছে। দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে সিআইডি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।’

শুধু সম্পদ জব্দ নয়, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিচার ও শাস্তির মাধ্যমে সমাজে বার্তা দিতে হবে যে অবৈধ সম্পদ ভোগের সুযোগ নেই। এতে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে।’

গত ১৫ মাসে জব্দ হওয়া ৪২১টি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাবেক পিএস তৌফিকা করিম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৭ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবও রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিয়োগ বাণিজ্য, বদলির তদবির, আসামির জামিনসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন। সেই অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট, গাড়ি ও জমি কেনা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কসের স্বত্বাধিকারী মো. খায়রুল বাশার বাহারের প্রায় ৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকার সম্পদ জব্দ করে সিআইডি। তদন্তে জানা যায়, তিনি ও তার সহযোগীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। ওই অর্থ দিয়ে কেনা ১২২ দশমিক ৪৫ শতাংশ জমি আদালতের নির্দেশে ক্রোক করা হয়।

পরের মাসে স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বর্ণ ব্যবসায়ী শ্যাম ঘোষের ১০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, অবৈধভাবে স্বর্ণ কেনাবেচার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ও দোকান কিনেছেন।

এছাড়া একই মাসে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তানভির শাকিল জয় ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ১ হাজার ২০৮ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পায় সিআইডি। পরে তার হিসাবের ৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনি ও রনির স্ত্রী ইমরানা জামান চৌধুরীর নামে থাকা মেঘনা ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়। অনুসন্ধানে অবৈধ অর্থে এসব শেয়ার কেনার প্রমাণ পাওয়ার পর আদালতের নির্দেশে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবৈধ সম্পদ ক্রোক, ফ্রিজ ও বাজেয়াপ্ত করা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী নীতির অংশ। তবে এটি কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। যার সম্পদের বৈধ উৎস দেখানোর সক্ষমতা নেই, সেটিই অবৈধ সম্পদ। বৈধতা প্রমাণ করতে পারলে সম্পদ ফেরত পাবেন, অন্যথায় রাষ্ট্র সেই সম্পদ জনকল্যাণে ব্যবহার করতে পারে।’ তার মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা অর্থ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় করা হলে তা কার্যকর বার্তা দেবে। এতে দুর্নীতির প্রবণতাও কমবে।

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *