
সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম বেড়েছে ডজনে ২০-৩০ টাকা
মে ৮, ২০২৬
দেশে ৯৬% মানুষ কখনো থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করায়নি
মে ৮, ২০২৬বিশ্ববাণিজ্যে বিপণনকৃত পণ্য বা সেবা উৎপাদন হয় ধাপে ধাপে। বিভিন্ন দেশে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে মূল্য সংযোজনের গোটা প্রক্রিয়াটি বৈশ্বিক ভ্যালু চেইন (জিভিসি) হিসেবে পরিচিত।
এ ভ্যালু চেইনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান (এমএনই)। উৎপাদন নেটওয়ার্ক সংগঠিত করা, মানদণ্ড নির্ধারণ ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো এ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে পণ্য ও সেবার মূল্য সংযোজন এবং রফতানি খাতে অবশ্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত। সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রকাশ করা এক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অবদান জিডিপির ৫ শতাংশেরও নিচে। আবার রফতানিতেও ৫ শতাংশে পৌঁছায়নি এমএনইগুলোর অবদান। দুই ক্ষেত্রেই এমএনইগুলোর অংশগ্রহণ ২০২০ সালেও ২০০৯-এর পর্যায়ে স্থির ছিল। এডিবির ‘গ্লোবাল ভ্যালু চেইনস অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট: এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট পলিসি রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনের মে ২০২৬ সংস্করণে এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
এডিবির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে পণ্য মূল্য সংযোজনে (জিভিএ) বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অবদান বিবেচনায় শীর্ষস্থানে রয়েছে হংকং। দেশটিতে এমএনইগুলোর মূল্য সংযোজনের হার জিডিপির ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। আর দেশটির মোট রফতানিতে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান প্রায় ৬০ শতাংশ। চীন ও সিঙ্গাপুরের উৎপাদন খাতে এমএনইগুলোর অবদান জিডিপির ৩৫ শতাংশের বেশি। ভিয়েতনাম, ব্রুনাই ও থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে এ হার ২০ শতাংশের কিছু কম। আর তালিকার একেবারে নিচে অবস্থানকারী বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার ৫ শতাংশেরও কম।
বর্তমানে এ পরিস্থিতি একই পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে সম্পৃক্ততা বাড়াতে নেটওয়ার্ক লাগে। এখানে এমএনইগুলোর মাধ্যমে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও ব্র্যান্ডিং করা গেলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এর সুবিধা নিতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এমএনইর উপস্থিতি খুবই ক্ষীণ। জ্বালানি খাতে তাদের উপস্থিতি আগের মতো নেই। কয়েকটি ব্যাংক চলে গেছে। রফতানির ক্ষেত্রে ইপিজেড-কেন্দ্রিক কোরীয় কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলেও আর কোথাও তাদের জোরালো উপস্থিতি দেখা যায় না।’
বাংলাদেশ কেন উৎপাদন খাতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ না থাকলে বিদেশী বিনিয়োগ বা এমএনইগুলো বাংলাদেশে আসবে না। এখানে লোডশেডিং, গ্যাসের প্রাপ্যতা, শ্রমিকের দক্ষতা যেমন নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে, তেমনি নীতির অনুমানযোগ্যতার অভাবও কাজ করছে। একেক সময় একেক ধরনের নীতিগত আদেশ জারি হয়। এমন পরিবেশে এমএনইগুলো আসবে না। আবার এখানে বিনিয়োগের জন্য স্থানীয় অংশীদারের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটিও এমএনইগুলোর বিনিয়োগের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ফলে দেশে পণ্য মূল্য সংযোজন হোক বা বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে সংযুক্তি হোক, এমএনইগুলোর সক্ষমতা বা অভিজ্ঞতার সুযোগ আমরা নিতে পারছি না।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ, টেকনোলজি ট্রান্সফার বা প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ। এখানে শিল্পোৎপাদন ও রফতানি খাতের বৃহদংশজুড়ে রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। বাংলাদেশে এ শিল্পের কারখানাগুলোয় মূল্য সংযোজনের কাজটি হয় খুবই নিম্নমাত্রায়। এসব কারখানায় মূলত আমদানীকৃত কাঁচামাল বা উপাদান সংযোজন করে তা রফতানি করা হয়। শিল্পটিকে কেন্দ্র করে ব্যাকওয়ার্ড বা ফরওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আবার তৈরি পোশাক শিল্পের উচ্চপ্রযুক্তি, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং বা গবেষণা উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) অংশে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের পারিপার্শ্বিকতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। এ পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন নেটওয়ার্কে বিভিন্ন অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ও এর সুফল ভোগ করার শর্তগুলোও বদলে গেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রযুক্তি, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং জিভিসিগুলোর নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামোসহ বিভিন্ন মাত্রায় এ পরিবর্তন ঘটেছে।
এডিবির ভাষ্যমতে, এমন প্রেক্ষাপটে বিগত কয়েক দশকে এশিয়া-প্যাসিফিকের অনেক দেশের সমৃদ্ধি ও সফলতায় বড় ভূমিকা রেখেছে উদার বাণিজ্যনীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা। এ সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে দেশগুলো। নীতিকৌশলের দিক থেকে রফতানি ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি জোর দেয়া হয়েছে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরেও। কৌশলগুলোর সফল বাস্তবায়ন দেশগুলোয় দ্রুত শিল্পায়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বাণিজ্য আর শুধু চূড়ান্ত পণ্য কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ক্রমশ গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিতে বাংলাদেশকে শুধু রফতানি বৃদ্ধি নয়, একই সঙ্গে পণ্যে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধির দিকেও মনোযোগ বাড়াতে হবে। এজন্য শিল্প খাতে উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবহার, ব্র্যান্ডিং, ডিজাইন ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় আরো ওপরের দিকে উঠে আসতে হবে বাংলাদেশকে। মূল্য সংযোজনে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে কার্যকর ও লাভজনক সংযুক্তি নিশ্চিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বহুজাতিকগুলোর অংশগ্রহণ। এ অংশগ্রহণকে কাজে লাগিয়ে শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, অর্থায়ন সংগ্রহ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভিয়েতনামের ইলেকট্রনিকস খাতের রফতানিতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে এফডিআই প্রবাহ।
বর্তমানে দেশভেদে মূল্য সংযোজন ও রফতানিতে বিভিন্ন মাত্রায় অবদান রাখছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। অ্যানালিটিক্যাল মাল্টিন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজ (এএমএনই) ডেটাবেজ অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিকের মোট রফতানিতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। এশিয়া-প্যাসিফিকে ব্রুনাই, হংকং, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে স্থানীয় পর্যায়ের উৎপাদন, মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানে বিদেশী সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান এখন ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের মতো ছোট ও উন্মুক্ত অর্থনীতিতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, রফতানি বাজার ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে অংশগ্রহণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে অনেক বহুজাতিক সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।
বাংলাদেশে অনেক বছর ধরে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে বেশ কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। তবে রফতানির পরিবর্তে মূলত স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণকে কেন্দ্র করেই সক্রিয় অধিকাংশের ব্যবসায়িক মডেল। এর মধ্যে এফএমসিজি বা ভোক্তাপণ্য খাতে ব্যবসা করছে ইউনিলিভার, রেকিট বেনকিজার, নেসলে, ম্যারিকো, প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল প্রভৃতি কোম্পানি। টেলিকম খাতে রয়েছে গ্রামীণফোন (টেলিনর), রবি আজিয়াটা (আজিয়াটা গ্রুপ বারহাদ), বাংলালিংক (ভিওন) ইত্যাদি। ব্যাংক খাতে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ম্যানুফ্যাকচারিং ও কেমিক্যাল খাতে রয়েছে লিন্ডে বাংলাদেশ, বার্জার পেইন্টস ইত্যাদি কোম্পানি।
ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খান। এফএমসিজি খাতের আরো তিনটি বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড ও ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে রয়েছেন তিনি। বণিক বার্তাকে মাসুদ খান বলেন, ‘দেশে এমএনইগুলোর শক্তিশালী উপস্থিতি না থাকার কারণে গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে কার্যকরভাবে সংযুক্ত হতে পারছে না বাংলাদেশ। বর্তমানে নতুন করে কেউ আসার বদলে বরং অনেকে চলেও যাচ্ছে। ম্যানুফ্যাকচারিং বর্তমানে ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে; কারণ সেখানে তারা বড় ধরনের স্কেল অব ইকোনমি বা বৃহদায়তনে উৎপাদনের সুবিধা পায়। আর বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত বা সচ্ছল শ্রেণী এখনো সেভাবে গড়ে না ওঠায় বৃহদায়তনে উৎপাদনের মাধ্যমে ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। এখানে এমএনইগুলো যে কঠোরভাবে পণ্যের মান, কমপ্লায়েন্স এবং নিয়ম-কানুন মেনে চলে, সেটি যদি স্থানীয় কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও করা যায়, তাহলে প্রতিযোগিতার একটি সুষম পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এছাড়া বাংলাদেশে ইজ অব ডুইং বিজনেস বা ব্যবসা করার পরিবেশ অনেক জটিল। এ জটিলতা ও সুষম পরিবেশের অভাবে বর্তমানে পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো বড় খাতে নতুন কোনো বহুজাতিক কোম্পানি আসছে না এবং বিদ্যমান কোম্পানিগুলোও কমপ্লায়েন্স ও রেগুলেশনের চাপে হিমশিম খাচ্ছে।’
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে সংযুক্ত হলেও এখানে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজনের দিক থেকে খুব একটা এগোতে পারেনি। যদিও বিগত দশকগুলোয় চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা এমনকি পাকিস্তানও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে সংযুক্তির ক্ষেত্রে খাতকেন্দ্রিক বৈচিত্র্য ও স্থানীয় পর্যায়ে রফতানি পণ্যে মূল্য সংযোজন—উভয় দিকেই এগিয়েছে।


