
বাংলাদেশের জিডিপিতে বহুজাতিকের অবদান ৫ শতাংশের নিচে
মে ৮, ২০২৬
আগামী বাজেট থেকেই খরচের হিসাব পাবেন করদাতারা
মে ৮, ২০২৬দেশে থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি এবং পরীক্ষা না করার প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জাতীয় থ্যালাসেমিয়া জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের ৯৬ শতাংশ মানুষ জীবনে একবারও থ্যালাসেমিয়া শনাক্তের পরীক্ষা করায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিয়ের আগে বাহক শনাক্তে অনাগ্রহ, রোগটি সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবের কারণেই দেশে থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাদের মতে, সময়মতো বাহক শনাক্ত করা গেলে নতুন থ্যালাসেমিয়া শিশু জন্মের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
জরিপ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের মানুষ সবচেয়ে কম থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করিয়েছে। এ বিভাগে জরিপে অংশ নেয়া ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ কখনো পরীক্ষা করায়নি। তুলনামূলকভাবে রংপুর বিভাগের পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও সেখানেও ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ জীবনে কখনো থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করায়নি।
শুধু পরীক্ষা নয়, থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতাও অত্যন্ত সীমিত। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ এ রোগ সম্পর্কে অনেক কম অবগত। জরিপে দেখা গেছে, গ্রামে ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে কিছুই জানে না, যেখানে শহরে এ হার ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে বেশি অজ্ঞতা দেখা গেছে, যেখানে ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না।
থ্যালাসেমিয়ার ভয়াবহতা শুধু পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়ছে অসংখ্য পরিবারের জীবনে। রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের থ্যালাসেমিয়া সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, মেয়ে ফৌজিয়া আক্তার রোদেলাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছেন মা শিখা আক্তার। মিরপুরের কালশী এলাকার নিম্ন আয়ের এ পরিবারের একমাত্র সন্তান রোদেলার পাঁচ বছর বয়সে থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। এর পর থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত রক্ত নিতে হাসপাতালে আসতে হয় তাকে। শিখা আক্তার জানান, মেয়ের চিকিৎসা এখন তাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। নিয়মিত রক্ত নেয়া, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং হাসপাতালে আসা-যাওয়ার খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে বড় অংকের অর্থ ব্যয় হয়। সীমিত আয়ের কারণে অনেক সময় সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন কমিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।
জরিপে আরো উঠে এসেছে, দেশে থ্যালাসেমিয়া বাহকের হারও উল্লেখযোগ্য। পুরুষদের মধ্যে বাহকের হার ১১ দশমিক ৯ ও নারীদের ১১ দশমিক ২ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে এ হার ১১ দশমিক ৬ ও শহরে ১১ শতাংশ। রংপুর বিভাগে থ্যালাসেমিয়া বাহকের হার সবচেয়ে বেশি, ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে রাজশাহী, যেখানে এ হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। চট্টগ্রামে ১১ দশমিক ২, ময়মনসিংহে ৯ দশমিক ৮ এবং খুলনা ও ঢাকায় সমানভাবে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া বাহক হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। বরিশালে এ হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, আর সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে সিলেটে, যেখানে বাহকের হার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া বাহকের হার সবচেয়ে বেশি, ১২ শতাংশ। ১৪-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। ২৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে হার তুলনামূলকভাবে কম, ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ৩০-৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
থ্যালাসেমিয়া রোধে বিয়ের আগে বাহক শনাক্ত পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই বলে জানান বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. শবনম জেরীন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়া জন্মগত ও বংশগত রক্তরোগ। এটি সম্পূর্ণ জেনেটিক কারণে হয়। বাবা-মা দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তবেই সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তবে একজন বাহক ও অন্যজন সুস্থ হলে সন্তান কখনো থ্যালাসেমিয়া রোগী হবে না। বাহকদের শরীরে একটি স্বাভাবিক এবং একটি অস্বাভাবিক জিন থাকে, কিন্তু তারা সাধারণত সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে এবং তাদের কোনো বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।’
তিনি আরো বলেন, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে বাহক শনাক্ত করা। কারণ দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। দুই বাহকের মধ্যে বিয়ে এড়ানো গেলে নতুন থ্যালাসেমিয়া রোগী জন্ম অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সাইপ্রাসসহ কয়েকটি দেশ জনসচেতনতা ও বাধ্যতামূলক স্ক্রিনিং কার্যক্রমের মাধ্যমে এভাবেই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।


