
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হতে পারে মোবাইল নেটওয়ার্ক
এপ্রিল ২০, ২০২৬
এক মাসে দুইবারে ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ৫৯৯ টাকা
এপ্রিল ২০, ২০২৬দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ঋণের পরিমাণ বেড়ে এখন প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা খাতটিতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
এদিকে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে সরকারি-বেসরকারি উৎসের পাশাপাশি আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ কেনা বাবদ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া জমেছে, যা এরই মধ্যে অর্ধলাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
চলতি বছরের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) বকেয়া বিলের পরিমাণ ৫২ হাজার ৩০০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এ বকেয়ার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানির গ্যাস বিল বাবদ পেট্রোবাংলার কাছে পাওনা ১১ হাজার ৬৩৪ কোটি ৬ লাখ টাকা। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ বকেয়া রয়েছে ৩ হাজার ৮৯১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
গ্যাস ও জ্বালানি তেলভিত্তিক আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও ফুয়েল পেমেন্ট বাবদ ১৭ হাজার ৩৫৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বকেয়া। এছাড়া যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ও আইপিপি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লার মূল্য ও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১৫ হাজার ৪৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা বকেয়া থাকার তথ্য দেন মন্ত্রী। সরকারি কোম্পানির ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও ফুয়েল পেমেন্ট বাবদ বকেয়া ৫ হাজার ৬২৩ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং হুইলিং (বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ) চার্জ বাবদ বকেয়া ১৯৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বলেও সংসদকে জানান বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিন গতকাল ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এসএম জাহাঙ্গীর হোসেনের একই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যাংক ঋণ ও বকেয়ার এ তথ্য জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা ঋণ ও বকেয়া দেশের সামগ্রিক জ্বালানি অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। ভবিষ্যতে এ খাতের টেকসই উন্নয়নে যা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, সরকারি-বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত দুই ধরনের ঋণের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। এর একটি হলো চলতি মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ, যা প্রধানত জ্বালানি আমদানির জন্য নেয়া হয়। অন্যটি প্রজেক্ট ঋণ, যা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি আমদানি ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ সাধারণত ছয় মাস পরপর পরিশোধ করতে হয়। আর প্রজেক্ট ঋণ পরিশোধ করতে হয় তিন মাস অন্তর। এসব ঋণ পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়া নির্ভর করে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর।
বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ বিক্রির বিপরীতে বকেয়া বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর্থিক চাপে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কোম্পানি ঋণ পরিশোধে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের নতুন করে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়ে গেছে। নিয়মিত অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংকগুলোও ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ঋণের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী সংসদে যে তথ্য তুলে ধরেছেন এটি এখন একটি নির্মম বাস্তবতা। বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ বেসরকারি উদ্যোক্তারা বকেয়ার অর্থ পর্যাপ্ত না পাওয়ায় ঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছেন। অনেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নেয়া ঋণ খেলাপির ঝুঁকি এড়াতে পুনরায় অন্য ব্যাংকের ঋণের (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) দ্বারস্থ হচ্ছেন। এতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকরা একাধিক ব্যাংকের ঋণের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতে অচলাবস্থা তৈরি হবে। সরকারের পক্ষে একবারে এ ঋণ পরিশোধ যেহেতু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আগের মতো যদি বিশেষ বন্ড ছেড়ে পরিশোধের ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয়া হয়, তাহলেও অন্তত এ খাতের উদ্যোক্তারা ঋণখেলাপির ঝুঁকি এড়াতে পারবেন।’
দেশের বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর দায় সরকার নিজের আয়ত্তে রেখে ঋণ ঝুঁকি এড়াতে পারবে, কিন্তু বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উদ্যোক্তাদের বিপুল পরিমাণ ঋণের দায় এড়ানোর সক্ষমতা নেই বলে মনে করেন অনেক উদ্যোক্তা। অনেক আইপিপি উদ্যোক্তা বকেয়া বিল না পাওয়ায় ব্যাংকের ঋণ খেলাপির বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিপিডিবিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে কনফিডেন্স গ্রুপ। ব্যাংক ঋণের বিষয়টি নিয়ে জানতে গ্রুপটির চেয়ারম্যান ইমরান করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের চাপ থাকা সত্ত্বেও অনেক কোম্পানি ক্রেডিট লিমিট ঠিক রাখতে পেরেছে। তবে আইপিপি খাতের প্রায় দুই ডজন কোম্পানি এখন ব্যাংক ঋণ খেলাপির বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এ খেলাপির ঝুঁকি এখন এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ব্যাংকগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে ঋণের আবেদন করবে সে অবস্থা নেই। এ পরিস্থিতি এতটা খারাপ পর্যায়ে আগে কখনো আসেনি। গত বছরের জুন পর্যন্ত বকেয়া পরিশোধ নিয়মিত ছিল। এর পর থেকে ৩০ শতাংশ করে পরিশোধ হচ্ছে। এ অর্থ দিয়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, জ্বালানি আমদানি এমনকি কেন্দ্র পরিচালনা এখন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো বিদেশী বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা যারা রয়েছেন, নিয়মিত অর্থ না পাওয়ায় তারা এখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগবিমুখ হচ্ছেন।’


