প্রশ্নোত্তরে জ্বালানিমন্ত্রী দেশে মজুদ গ্যাস ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব
এপ্রিল ২০, ২০২৬
ইসলামাবাদ আলোচনা বসবে না ইরান ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা হুমকি
এপ্রিল ২০, ২০২৬
প্রশ্নোত্তরে জ্বালানিমন্ত্রী দেশে মজুদ গ্যাস ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব
এপ্রিল ২০, ২০২৬
ইসলামাবাদ আলোচনা বসবে না ইরান ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা হুমকি
এপ্রিল ২০, ২০২৬

জ্বালানি বাণিজ্যের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান শক্তিশালী করছে রাশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি বাজারে, যেখানে বিকল্প উৎস খোঁজার প্রবণতা দ্রুতই বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার গুরুত্ব বাড়ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মস্কোর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এ সুযোগে জ্বালানি বাণিজ্যের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে রাশিয়া।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন রাশিয়াকে নতুন কৌশল গ্রহণে উৎসাহিত করেছে। ঐতিহ্যগত জ্বালানি রফতানিকারক হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশটি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা—চারটি দেশের সঙ্গেই জ্বালানি সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে মস্কো, যা দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান আরো সুসংহত করছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার দক্ষিণ এশিয়া কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ভারত। চলতি বছরের মার্চে দেশটির রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ছাড়িয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ভারত দ্রুত বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ পুনরায় শুরু এবং সার উৎপাদনে যৌথ উদ্যোগের আলোচনাও চলছে, যা দুই দেশের জ্বালানি ও কৃষি খাতে সম্পর্ক আরো গভীর করতে পারে। দুই দেশের বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বড় অংশই নিজস্ব মুদ্রায় নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা ডলারনির্ভরতা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও রাশিয়া এখন ‘সুইং সাপ্লায়ার’ বা বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে। জ্বালানি সংকটে থাকা দেশটি এরই মধ্যে ৭ লাখ ৩৩ হাজার ব্যারেলের বেশি রুশ তেল আমদানি করেছে। অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে থাকা শ্রীলংকাও রাশিয়াকে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে দেখছে। দেশটিতে রুশ ডিজেল ও জেট ফুয়েল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি খাতে ক্ষুদ্র মডুলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও এসেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি সহযোগিতাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। ২৯ মার্চ এক বৈঠকের মাধ্যমে ঢাকায় রাশিয়া ও বাংলাদেশ পক্ষ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে এর প্রভাব এবং বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ওই বৈঠকে উভয় পক্ষই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক তাৎক্ষণিক জ্বালানি প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার সমন্বয়ে এগোচ্ছে। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় চাওয়া হয়েছে। এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক আরো গভীর হচ্ছে। প্রকল্পটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি রাশিয়ার জন্য বর্তমানে একটি অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের কৌশলগত পণ্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়ার টিকে থাকার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে গত ১০ বছরে তাদের জ্বালানি ভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য আগে মূলত ইউরোপকেন্দ্রিক ছিল, তবে বর্তমানে তারা এটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার বা গ্লোবালাইজ করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার আগে থেকেই শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থাকায় এ অঞ্চলগুলোতে তারা জ্বালানি বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরো সুসংহত করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত শুরু থেকেই রাশিয়ার জ্বালানির একটি বড় আমদানিকারক ছিল এবং চীনও তাদের অন্যতম শীর্ষ ক্রেতা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার ঐতিহাসিক সম্পর্ক, যেমন বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র বাণিজ্য, রাশিয়ার উপস্থিতিকে আগেই নিশ্চিত করেছিল। তবে আগে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ কম থাকলেও বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার জ্বালানি রফতানির একটি আদর্শ ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

এ সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত রাশিয়ার জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আইনস্টাইনের একটি কথা ছিল যে প্রতিটি সংকটই একটি সুযোগ। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ইরান বা অন্য দেশগুলোর জন্য সমস্যা হলেও রাশিয়ার মতো দেশের জন্য এটি একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রাশিয়া এ পরিস্থিতিকে যতটা সম্ভব কাজে লাগানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা রাশিয়ার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মতো দেশগুলো দ্রুত বাড়তে থাকা জ্বালানির প্রয়োজন মেটাতে বিকল্প উৎস খুঁজছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে। এদিকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোও রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিচ্ছে। এ বাণিজ্য বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার সম্পৃক্ততার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো বিকল্প আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা। নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলারনির্ভর লেনদেনের পরিবর্তে রুবল, ইউয়ান বা স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খরচ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞা, পেমেন্ট জটিলতা এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করছে। সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি বাণিজ্যকে প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বৃহত্তর কৌশলগত অবস্থান তৈরি করছে রাশিয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবেলার পদক্ষেপ নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক কৌশল, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *