
ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম বাড়ল ২২১৬ টাকা
এপ্রিল ১৫, ২০২৬
দুদিনের মধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত ট্রাম্পের
এপ্রিল ১৫, ২০২৬ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথি অনুযায়ী, টিইই-০১বি নামের স্যাটেলাইটটি ২০২৪ সালের শেষ দিকে চীন উৎক্ষেপণ করে। এর পরই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়
হালনাগাদ প্রযুক্তি যার হাতে থাকে সে-ই যুদ্ধে বাড়তি সুবিধা পায়। সেই লক্ষ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধে মার্কিন স্যাটেলাইট ইমেজিং কোম্পানি দেশটির প্রশাসনের নির্দেশ মেনে তেহরানের তথ্য প্রাপ্তিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। কিন্তু পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য পুরোপুরি প্রতিকূল ছিল, এমনও নয়। বরং গোপন চুক্তি, চীনের বানানো একটি বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের সামরিক ব্যবহার এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মিলিয়ে যুদ্ধে দরকষাকষিতে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে ধরে রেখেছে দেশটি।
এফটির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান গোপনে একটি চীনা স্পাই স্যাটেলাইট অর্জন করেছিল। এটি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করার ক্ষেত্রে ‘শক্তিশালী সক্ষমতা’ দিয়েছে।
ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথি অনুযায়ী, টিইই-০১বি নামের স্যাটেলাইটটি ২০২৪ সালের শেষ দিকে চীন উৎক্ষেপণ করে। এর পরই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সময়সূচক অবস্থান-তালিকা, স্যাটেলাইট ছবি ও কক্ষপথ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরানি সামরিক কমান্ডাররা এ স্যাটেলাইট ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন। গত মার্চে এসব অবস্থানের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে ছবি তোলে কৃত্রিম উপগ্রহটি।
নথিতে দেখা যায়, স্যাটেলাইটটি ১৩, ১৪ ও ১৫ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ারবেসের ছবি তোলে। ১৪ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, এ ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন উড়োজাহাজ হামলার শিকার হয়েছে এবং পাঁচটি ইউএস এয়ারফোর্স রিফুয়েলিং জেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়
অদ্ভুত এক চুক্তি ‘ইন-অরবিট ডেলিভারি’
টিইই-০১বি তৈরি ও উৎক্ষেপণ করে চীনা কোম্পানি আর্থ আই। সংস্থাটি নিজেদের ‘ইন-অরবিট ডেলিভারি’ পরিষেবাদাতা হিসেবে পরিচয় দেয়। এমন এক অল্প পরিচিত রফতানি মডেল এটি, যেখানে চীনে উৎক্ষেপণ করা মহাকাশযান কক্ষপথে পৌঁছানোর পর বিদেশী গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
চুক্তির অংশ হিসেবে আইআরজিসি-কে বেইজিংভিত্তিক স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ ও ডাটা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইম্পোসাট পরিচালিত বাণিজ্যিক গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়। এর নেটওয়ার্ক এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ব্যবহার অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এবং তাদের জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
মার্কিন ঘাঁটিতে নজরদারি
নথিতে দেখা যায়, স্যাটেলাইটটি ১৩, ১৪ ও ১৫ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ারবেসের ছবি তোলে। ১৪ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, এ ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন উড়োজাহাজ হামলার শিকার হয়েছে এবং পাঁচটি ইউএস এয়ারফোর্স রিফুয়েলিং জেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টিইই-০১বি আরো কিছু এলাকায় নজরদারি চালিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। এর মধ্যে রয়েছে জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি এয়ারবেস, বাহরাইনের মানামায় মার্কিন ফিফথ ফ্লিট ঘাঁটির কাছাকাছি এলাকা, ইরাকের ইরবিল বিমানবন্দর, কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েহরিং ও আলী আল সালেম ঘাঁটি, জিবুতির মার্কিন ঘাঁটি ক্যাম্প লেমনিওর এবং ওমানের দুকম ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। এছাড়া বেসামরিক অবকাঠামোর মধ্যে নজরদারিতে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) খোর ফাক্কান কনটেইনার বন্দর এলাকা, কিদফা বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র, বাহরাইনের এলবা অ্যালুমিনিয়াম কারখানা।
টিইই-০১বি প্রায় অর্ধ-মিটার রেজোলিউশনের ছবি তুলতে সক্ষম, যা পশ্চিমা বাণিজ্যিক হাই-রেজোলিউশন ইমেজারির সমতুল্য। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ, যানবাহন ও অবকাঠামোর পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব। অন্যদিকে আইআরজিসির সবচেয়ে উন্নত স্যাটেলাইট নূর-৩ প্রায় ৫ মিটার রেজোলিউশনের—যা অনেক কম কার্যকর
সায়েন্স পো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, ‘স্যাটেলাইটটি স্পষ্টতই সামরিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে। কারণ এটি পরিচালনা করছে আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স, ইরানের বেসামরিক কোনো মহাকাশ কর্মসূচি নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিদেশী এ সক্ষমতা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আগেভাগেই লক্ষ্য শনাক্ত এবং হামলার সাফল্য যাচাইয়ে সহায়তা করে।’
টিইই-০১বি প্রায় অর্ধ-মিটার রেজোলিউশনের ছবি তুলতে সক্ষম, যা পশ্চিমা বাণিজ্যিক হাই-রেজোলিউশন ইমেজারির সমতুল্য। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ, যানবাহন ও অবকাঠামোর পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব। অন্যদিকে আইআরজিসির সবচেয়ে উন্নত স্যাটেলাইট নূর-৩ প্রায় ৫ মিটার রেজোলিউশনের—যা অনেক কম কার্যকর।
চুক্তির আর্থিক দিক
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ ডলার দিয়ে স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ অধিগ্রহণে সম্মত হয়। চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল স্যাটেলাইট, উৎক্ষেপণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, ডাটা অবকাঠামো ও ‘বিদেশী অংশীদার’ সেবার খরচ।
স্যাটেলাইট ব্যবস্থায় গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এটি স্যাটেলাইট পরিচালনার সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক সরবরাহ করে, যার মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ করা যায়। চীনের সঙ্গে চুক্তিতে বিষয়টি ইরানকে দিয়েছে কৌশলগত সুবিধা। সিআইএর সাবেক বিশ্লেষক জিম ল্যামসনের মতে, এটি মহাকাশ ব্যবস্থাপনাকে ছড়িয়ে দেয়ায় ইরানের একটি কৌশল। কারণ দেশটির নিজস্ব গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো সহজেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়া ও হামলা
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, চলমান সংঘর্ষে তারা ইরানের ভেতরে একাধিক মহাকাশ ও স্যাটেলাইট-সম্পর্কিত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ইরান স্পেস এজেন্সির প্রধান গবেষণা কেন্দ্রও রয়েছে।
আইডিএফের দাবি, ওই কেন্দ্র সামরিক স্যাটেলাইট উন্নয়ন ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং ‘মধ্যপ্রাচ্যের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার নির্দেশনা’ দিচ্ছিল।
গোয়েন্দা বিশ্লেষণ
ল্যামসন আরো বলেন, ‘ইরানের নতুন স্যাটেলাইট ক্ষমতা নিজস্ব মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং রুশ স্যাটেলাইট ডাটার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহৃত হলে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক টুলে পরিণত হবে।’
ইরান এরই মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে মহাকাশ সহযোগিতা বাড়িয়েছে। দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একাধিক ইরানি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন তার বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতকে ‘বেসামরিক’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে এটি দ্বৈত-ব্যবহারের প্রযুক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে।
আগে থেকেই অভিযোগ রয়েছে যে চীনা কোম্পানি চ্যাং গুয়াং স্যাটেলাইট টেকনোলজি হুথি বিদ্রোহীদের কাছে স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহ করেছে, যা লোহিত সাগরে মার্কিন ও বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করতে ব্যবহৃত হয়।
ইম্পোস্যাট সম্পর্কে মার্কিন কংগ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের সামরিক বাহিনীর বিশেষ বিভাগ পিএলএ অ্যারোস্পেস ফোর্সের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
সিএসআইএসের বিশেষজ্ঞ আইডান পাওয়ার্স-রিগস বলেন, ইম্পোস্যাট চীনের বেসামরিক মহাকাশ খাতের একটি উদীয়মান নাম হলেও এটি রাষ্ট্র ও সামরিক প্রতিষ্ঠানেরই অংশ।
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সতর্কতা
সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ডেনিস উইল্ডার বলেন, চীন অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে ইরানকে কিছু অস্ত্র সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সিল্কওর্ম’ অ্যান্টি-শিপ মিসাইল।
একজন সাবেক পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘চীনের কোনো কোম্পানি সরকারের অনুমতি ছাড়া এমন কাজ করতে পারে না। এটি বহুদিন ধরেই স্পষ্ট যে ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে চীন, তবে তা আড়ালে রাখার চেষ্টা করছে।’
অবশ্য চীন, আর্থ আই, ইম্পোস্যাট, মার্কিন প্রশাসন ও ইরান কেউই বিষয়টি সরাসরি মন্তব্য করেনি। চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা চীনের বিরুদ্ধে অনুমানভিত্তিক ও ইঙ্গিতপূর্ণ বিভ্রান্তিকর তথ্যের দৃঢ় বিরোধিতা করি।’
তারা আরো জানায়, ‘আমরা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ অবস্থান বজায় এবং শান্তি আলোচনায় ভূমিকা রাখি। সংঘাত বাড়ায় এমন কোনো কর্মকাণ্ডে আমরা জড়িত নই।’

