
মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটনে ভাষণ দিলেন ডা. জুবাইদা রহমান
মার্চ ২৫, ২০২৬১২ মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরে নতুন সচিব
মার্চ ২৬, ২০২৬ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস সচিবালয় ১৯৭১-এ বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনাবলি নিয়ে একটি আইনি দলিল তৈরি করে। এটি ১৯৭২ সালের জুনে প্রকাশিত হয়।
এতে ‘দ্য ক্র্যাকডাউন ইন ঢাকা’ শীর্ষক অংশে ১৯৭১ সালের ২৫ ও ২৬ মার্চের হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা উঠে এসেছে। সে অংশটি এখানে তুলে ধরা হলো—
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ করাচিতে ফিরে যান এবং সেদিন রাত ১০টার দিকে সেনাবাহিনী ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে শুরু করে। জেনারেল টিক্কা খানের নির্দেশে সেনারা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, যা ‘আর্মি ক্র্যাকডাউন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, এতে একটি সাঁজোয়া, একটি পদাতিক এবং একটি আর্টিলারি—মোট তিনটি ব্যাটালিয়ন অংশ নেয়। এ ৪৮ ঘণ্টায় ঠিক কতজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, তা নির্ভুলভাবে বলা অসম্ভব; তবে সংখ্যা হাজারের ঘরে ছিল—এটুকু নিশ্চিত।
অভিযানটি ছিল সুপরিকল্পিত। প্রায় ২ ঘণ্টা কোনো গুলি চালানো হয়নি। প্রথমে সেনারা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ঘিরে ফেলে এবং অবস্থান নেয়। মধ্যরাতের কিছু আগে গুলি শুরু হয় এবং ভোর ৬টা বা ৭টা পর্যন্ত চলে। পরদিন আবার শুরু হয়ে সেদিন ও রাতজুড়ে বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে।
প্রথম দিকের লক্ষ্যবস্তুর একটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক উভয়ের ওপরই আক্রমণ চালানো হয়। আওয়ামী লীগের সমর্থক অনেক ছাত্র ‘হরতাল’ ও অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল।
সন্ধ্যার মধ্যেই সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তা পাওয়া যায়। ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের প্রবেশমুখে কিছু অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে, তবে তারা ছিল নিরস্ত্র। রাত প্রায় ১টার দিকে ক্যাম্পাসে হামলা শুরু হয়। প্রথম আঘাত হানা হয় ইকবাল হলে, যা ছিল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্র। সেনাবাহিনী মর্টার, ট্যাংক, কামান, মেশিনগান ও ট্রেসার বুলেটসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে। প্রচণ্ড শব্দে গুলিবর্ষণ চলে সকাল ৭টা পর্যন্ত।
এরপর হামলা চালানো হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। এর পরে জগন্নাথ হলে, যেখানে হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীরা থাকত। এসব হল থেকে যারা পালাতে পারেনি, সেনারা তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে। হলগুলোসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো কয়েকটি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। একটি মাত্র স্থানে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, সেটা ইকবাল হল থেকে। সেখান থেকে কিছু হালকা অস্ত্রের গুলি ছোড়া হয়, তবে তা ৩৫-৪০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়নি। প্রতিরোধের দুর্বলতা বোঝা যায় সেনা কন্ট্রোল সেন্টারের একটি বার্তা থেকে; তারা জানতে চায়, ইকবাল হলে কত অস্ত্র পাওয়া গেছে। উত্তরে জানানো হয়, ‘মাত্র ৫০টি রাইফেল।’ পরে নির্দেশ দেয়া হয়, শহরের বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশি করে পাওয়া সব অস্ত্রের সংখ্যাকে ইকবাল হলের হিসাবের সঙ্গে যোগ করতে।
শুধু ছাত্রাবাস নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকাতেও অভিযান চালানো হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, যিনি পরে ইউরোপে পালিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীর নৃশংসতার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন—সেনাবাহিনীর কাছে হত্যা করতে হবে এমন মানুষদের তালিকা ছিল। কিছু নির্দিষ্ট কোয়ার্টারেই হামলা চালানো হয়। যেগুলোতে তারা আক্রমণ করে, সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক সব পুরুষকে হত্যা করার নির্দেশ ছিল।
কিছু মানুষ অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। অধ্যাপক আনিসুর রহমান বর্ণনা করেছেন, তিনি বাইরে তালা লাগিয়ে রাখায় হামলাকারীরা ভেবেছিল তিনি বাসায় নেই। তিনি, তার স্ত্রী ও সন্তানরা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা হামাগুড়ি দিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। এ সময় তারা শুনতে পান, তার সহকর্মী অধ্যাপক গুহঠাকুরতা ও মনিরুজ্জামানকে টেনে বের করে গুলি করা হচ্ছে। অবশ্য বলা হয়ে থাকে যে উর্দু জানার পরও ভুলবশত অধ্যাপক মুনিরুজ্জামানকে হত্যা করা হয়েছিল এবং তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়।
যারা উর্দুতে কথা বলতে পেরেছেন, তাদের অনেকেই রক্ষা পেয়েছেন। এক শিক্ষকের স্ত্রী, যিনি সাবলীল উর্দু বলতে পারতেন, তাকে এক সৈনিক জানায়—তাদের ওপর নির্দেশ ছিল সবাইকে হত্যা করার, কিন্তু সেই আদেশ পালন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেকেই পরিবারের করুণ মিনতির কারণে বেঁচে যান।
মোট প্রায় ১০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিহত হন, যাদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক জি সি দেব। ছাত্র নিহতের সংখ্যা কয়েকশ বলে ধারণা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ৭ মার্চ থেকেই বন্ধ থাকায় অনেক ছাত্র বাড়ি চলে গিয়েছিল—না হলে নিহতের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারত।
জগন্নাথ ও সলিমুল্লাহ হলের বাইরে খোলা মাঠে গণকবর খোঁড়া হয়। ইকবাল হল ও অন্যান্য স্থান থেকে ট্রাকে করে মরদেহ এনে সেখানে ফেলে মাটিচাপা দেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কবরের মাটি ফুঁড়ে হাত-পা বেরিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর লাইব্রেরি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ক্যাম্পাসে অবস্থিত ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরিকে ভুল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ভেবে আক্রমণ করা হয়। সেখানে আশ্রয় নেয়া আটজন বাঙালি পুলিশ সদস্যকে একটি ছোট কক্ষে গুলি করে হত্যা করা হয়। একইভাবে কাছাকাছি বস্তি থেকে আশ্রয় নিতে আসা প্রায় ৩০ জন সাধারণ মানুষকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলাটি যেমন ভয়াবহ ছিল, তার চেয়েও বড় গণহত্যা চালানো হয়েছিল শহরের পুরনো অংশে বসবাসকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর, যারা বাঁশ ও চাটাই দিয়ে তৈরি সাধারণ ঘরে বাস করত। পুরনো শহরে এ হামলা শুরু হয় মধ্যরাতের কিছু পরেই। রাস্তায় যাকে দেখা গেছে তাকেই হত্যা করা হয়েছে এবং সারারাত গুলির শব্দ শোনা গেছে।
ভিক্টোরিয়া স্কোয়ারে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে নিজেদের ট্যাক্সিতে ঘুমিয়ে থাকা ২০ জন ট্যাক্সিচালককে হত্যা করা হয়। নদী পারাপারের লঞ্চ স্টেশনে আশ্রয় নেয়া প্রায় ৩০০ জন কুলি ও যাত্রী নিহত হন সেনাদের হাতে। পরদিন সকালে বেতারে পুরো শহরে কারফিউ অব্যাহত থাকার ঘোষণা দেয়া হয়। অনেকেই যারা এ ঘোষণা শোনেননি এবং সকালে বাইরে বের হয়েছিলেন তারাও গুলিতে নিহত হয়েছিলেন।
২৬ মার্চ দিনের বেলায় সেনাবাহিনী আবার পুরান ঢাকায় ফিরে আসে এবং পুরো রাস্তা ও দোকানের সারিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। যারা পালানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। এর একটি ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়, সেনাবাহিনী ধারণা করেছিল যে বিদ্রোহী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা এখানে লুকিয়ে আছে এবং দরিদ্র এলাকাগুলোতেই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বেশি সমর্থন ছিল। পরে সেনাবাহিনী এ অভিযানকে ‘বস্তি পরিষ্কার’ বলে উল্লেখ করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোনো ধরনের বাছবিচার করা হয়নি—হিন্দু ও মুসলিম উভয় এলাকাতেই আগুন দেয়া হয় এবং রাস্তায় যাকে দেখা গেছে তাকেই গুলি করা হয়েছে।
এভাবে ধ্বংস হওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল—ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে অবস্থিত কালীবাড়ি মন্দির ও আশপাশের দুটি গ্রাম, যেখানে প্রায় দুই হাজার হিন্দু বসবাস করত; চক্রী পট্টির হিন্দু এলাকা; পুরান ঢাকার রেললাইনের পাশের বস্তি এলাকা; বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা; এবং বিভিন্ন বাজার যেমন—রায় (সাহেব) বাজার, শাঁখারীবাজার, পুরনো কাঠের বাজার, লক্ষ্মীবাজার ও শান্তিনগর বাজার।
প্রথম আক্রমণের পর কয়েকদিন ধরে আগুন লাগানো ও হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতাদের বাড়ি এবং হিন্দুদের লক্ষ্য করে।
পুরান ঢাকার শাঁখারীপট্টি এলাকায়, যেখানে শঙ্খশিল্পীরা বসবাস করত, রাস্তার দুই প্রান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। সবাইকে ঘর থেকে বের হতে বলা হয়। হিন্দুদের মুসলমানদের থেকে আলাদা করা হয়। মুসলমানদের বাড়িতে ফিরে যেতে বলা হয় এবং হিন্দুদের মেশিনগান দিয়ে হত্যা করা হয়।
মিশনারিরা যখন প্রশ্ন করেন কেন হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে, তখন বারবার বলা হয়—‘হিন্দুরা রাষ্ট্রের শত্রু।’ অনেক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী মনে করত পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের পেছনে হিন্দুরাই মূল শক্তি। যদিও তারা জনসংখ্যার ২০ শতাংশেরও কম ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রচারণার প্রভাবে তারা ভুলভাবে বিশ্বাস করত যে বাঙালি জনগণ ও আওয়ামী লীগ হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত এবং তারা ভারতের এজেন্ট, যারা পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে চায়। যদিও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অনেক হিন্দু আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু তারপরও তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ছিল মুসলমানদের হাতে এবং তাদের সদস্যদের মধ্যে খুব কমই হিন্দু ছিল।
এ দমন অভিযানে সেনাবাহিনীর আরেকটি প্রধান লক্ষ্য ছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং পুলিশ বাহিনী। ২৫ মার্চ রাতেই ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বাঙালি সদস্যরা আসন্ন হামলার খবর পেয়েছিলেন এবং তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করে দেয়। পিলখানায় তাদের ব্যারাকে কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধ হয়, পরে তারা পরাজিত হয় বা পালিয়ে যায়। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেও হামলা চালানো হয়। প্রথমে ট্যাংক ব্যবহার করা হয়, তারপর গুলি চালানো হয়। এরপর সেনারা ঢুকে পড়ে এবং ব্যারাকগুলো ধ্বংস করে আগুন লাগিয়ে দেয়। খুব কম লোকই বেঁচে থাকতে পেরেছিল বলে ধারণা করা হয়। শহরের বিভিন্ন থানায়ও হামলা হয় এবং শত শত পুলিশ সদস্য নিহত হয়। এক পুলিশ পরিদর্শক ২৭ মার্চ সকালে জানান, ‘আমার জেলায় ২৪০ জন কনস্টেবল ছিল, এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ জনকে পেয়েছি—সবাই মৃত।’
বিহারিরাও এ হামলায় অংশ নিতে দেরি করেনি। মোহাম্মদপুর ছিল প্রধানত বিহারিদের এলাকা। ২৬ মার্চ তারা বাঙালিদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়। ২৬ মার্চ ভোরে সেনাবাহিনীর রেডিওতে একটি বার্তা প্রচার করা হয়, যেখানে সারা শহরের ইউনিট কমান্ডারদের অভিনন্দন জানিয়ে বলা হয়—‘তোমরা পাকিস্তানকে রক্ষা করেছ।’ পরে ভুট্টোও একই কথা বলেন।
২৬ মার্চ বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির রেডিওতে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা (মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণায় বলেন, আমি বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক মেজর জিয়া এতদ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি) করা হয় এবং প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমান রাত ১টা ৩০ মিনিটে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের বাসাতেই অবস্থান করছিলেন। তাকে ছাড়াই আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা পালিয়ে ভারতে গিয়ে কলকাতায় অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। ২৬ মার্চ রাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেন, তিনি সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়, সংবাদপত্রে সেন্সরশিপ আরোপ করা হয় এবং সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।


