
মার্কিন জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ট্রাম্পের বড় পরিকল্পনা
ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীন হয়ে রাশিয়ায় যাচ্ছে বিদেশী গাড়ি
ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬অতীতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নানা বিতর্ক, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি তৈরি করেছিলেন।
অতীতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নানা বিতর্ক, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি তৈরি করেছিলেন। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজার কিংবা বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্য থেকেই পুঁজিবাজারের নেতৃত্ব বাছাই করা হয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশেও পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বিএসইসির শীর্ষপদে নিয়োগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৫ বছর ধরে বাজারটি ক্রমাগত সুশাসনের দুর্বলতা, সীমিত সংস্কারের গতি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাসের সম্মুখীন হয়েছে। গত প্রায় দুই বছরে নতুন কোনো আইপিও আসেনি। তাছাড়া বিগত সময়ে যে আইপিওগুলো অনুমোদিত হয়েছে সেগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা নিম্নমানের কোম্পানি ছিল, যা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে এবং অনেক বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে এমন একজন ব্যক্তি থাকা প্রয়োজন যিনি পুঁজিবাজার সম্পর্কে গভীর ও ব্যবহারিক জ্ঞান রাখেন। পুঁজিবাজারের জন্য এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যিনি আর্থিক বাজারের ইকোসিস্টেমের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন এবং বাস্তবমুখী বাজার পরিচালনায় সফল হয়েছেন; কেবল একজন তাত্ত্বিক বা আমলাতান্ত্রিক নিয়োগপ্রাপ্ত কেউ নন।
বিগত সময়ে বিএসইসির নেতৃত্বে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপস্থিতি নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যার মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ ও দুর্বল নিয়ন্ত্রক শাসন অন্তর্ভুক্ত, যা বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এমনকি শ্রীলংকা ও ভারতের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে। কারণ সেখানে পেশাদারত্ব রয়েছে। আমাদের পুঁজিবাজারেও অনেক অভিজ্ঞ লোক আছেন যারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিচালনার জন্য যোগ্য। কিন্তু এক্ষেত্রে একজন নিরপেক্ষ এবং স্বার্থের সংঘাত নেই এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। আমাদের এখানে নৈতিক মানদণ্ড বিবেচনায় উত্তীর্ণ এমন ব্যক্তি পাওয়া বেশ দুষ্কর। যদি এমন ব্যক্তি পাওয়া যায় তাহলে ভালো নিয়োগ দিতে সমস্যা নেই। তবে শুধু একজন ভালো চেয়ারম্যান নিয়োগ দিলেই পুঁজিবাজার ভালো হয়ে যাবে এমন নয়। এক্ষেত্রে অর্থনীতি ভালো না হলে পুঁজিবাজারও ভালো হবে না। তাছাড়া ভালো শেয়ারের জোগান দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে, বাজারের সমস্যা বুঝতে হবে। এ সবকিছু যদি একসঙ্গে করা সম্ভব হয় তাহলে বাজার পরিস্থিতি ভালো করা সম্ভব।’
বিশ্বের অনেক দেশে সংকটকালে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে ভালো করেছেন। ১৯৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসইসির প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে জোসেফ পি কেনেডি সিনিয়রকে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি কোনো শিক্ষাবিদ বা প্রথাগত আমলা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট পেশাদার ব্যক্তি। কেনেডি বাজারের অভ্যন্তরীণ ফাঁকফোকর সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলেন, যা তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং বাজার পুনরুদ্ধারে সাহায্য করেছিল।
শ্রীলংকায় কেন বালেন্দ্র ও নালকা গোদাহেওয়ার মতো করপোরেট ব্যক্তিত্বদের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, যা করপোরেট শৃঙ্খলা ও বাজারের স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছিল। পাকিস্তানেও শওকত তারিন ও জাফর হিজাজির মতো অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের সময়ে করপোরেট সুশাসন জোরদার করা হয়েছে এবং ইনসাইডার ট্রেডিং বা কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীতে আমাদের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সবাই ছিলেন অধ্যাপক এমন নজিরও রয়েছে। শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়, স্টক এক্সচেঞ্জেও অধ্যাপকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমি তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, ওনাদের পুঁজিবাজার সম্পর্কে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান ছিল। অন্যদিকে আমাদের আমলাদের ক্ষেত্রে যেটি দেখা গেছে, তারা পুঁজিবাজার সম্পর্কে তেমন কোনো জানাশোনা রাখেননি। বর্তমান পুঁজিবাজার যে কোথায় চলে গেছে সে বিষয়ে ওনাদের ধারণা নেই। আমাদের পুঁজিবাজারের যে সমস্যা সেটি বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সমাধান করতে পারবে না। পুঁজিবাজারকে ন্যূনতম আঞ্চলিক মানে নিয়ে যেতে হলেও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয়ার বিকল্প নেই। পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উচ্চমানের নৈতিক মানদণ্ড রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগ করা হলে স্বার্থের সংঘাত থাকবে না। তাছাড়া পুরো বিশ্বেই এ ধরনের চর্চা প্রচলিত রয়েছে, তাই আমাদের এখানেও সেটি করা উচিত বলে আমি মনে করি।’


