
প্রথম বক্তৃতায় জাইমা রহমান নারীরা সুযোগ পেলে জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দেয়
জানুয়ারি ১৯, ২০২৬
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা বিবেচনা করছে এনসিপি
জানুয়ারি ১৯, ২০২৬আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের আপিল শুনানি শেষ হয়েছে গতকাল। শুনানি শেষে কয়েকটি আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী হারিয়েছে বিএনপি। আর বৈধতা ফিরে পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় পার্টির অনেক প্রার্থী।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের আপিল শুনানি শেষ হয়েছে গতকাল। শুনানি শেষে কয়েকটি আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী হারিয়েছে বিএনপি। আর বৈধতা ফিরে পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় পার্টির অনেক প্রার্থী।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, শেষ দিনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ২৩ জন। আর সব মিলিয়ে ৪১৭ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে বৈধ প্রার্থীর তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। তবে প্রাথমিকভাবে মনোনয়নপত্র বৈধ হলেও আপিল শুনানিতে প্রার্থিতা হারিয়েছেন অনেকেই। দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটার তালিকার সত্যতা নিশ্চিত না করার মতো কারণ দেখিয়ে আপিল নিষ্পত্তি করেছে নির্বাচন কমিশন।
যাদের মনোনয়নপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তা বাতিল করেছিলেন, তারা পরে ইসিতে এ বিষয়ে আপিল করেন। অবৈধ ঘোষিত প্রার্থীরা নিজেদের মনোনয়নের পক্ষে এবং বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের মনোনয়নের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও আপত্তি থাকার ভিত্তিতে অন্য পক্ষ ইসিতে আপিল আবেদন করার সুযোগ পান। ১০ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) রিটার্নিং কর্মকর্তাদের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল-শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে আপিল-শুনানি শেষে দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হেভিওয়েট প্রার্থী হারিয়েছে বিএনপি৷। তাদের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ ছিল। এ তালিকায় আছেন যশোর-৪ আসনের টিএস আইয়ুব, কুমিল্লা-৪ আসনের মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর এবং কুমিল্লা-১০ আসনের আব্দুল গফুর ভুঁইয়ার মতন হেভিওয়েট প্রার্থীরা।
প্রাথমিক মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময়েই ঢাকা ব্যাংকে ঋণখেলাপির দায়ে যশোর-৪ আসনের টিএস আইয়ুবের প্রার্থিতা বাতিল করেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরবর্তী সময়ে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেও সফল হননি তিনি। উল্লেখ্য, একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার ছেলে ফারহান সাজিদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে কুমিল্লা-৪ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকে প্রাথমিকভাবে বৈধ ঘোষণা করলেও তার বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণখেলাপির অভিযোগে আপিল করে একই আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) হাসনাত আবদুল্লাহ। এরপর আপিল শুনানিতে ঋণ পরিশোধসংক্রান্ত কাগজপত্রে অসংগতি ও অভিযোগের বিপরীতে যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায় মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করা হয়।
একইভাবে শুনানির শেষ দিনে কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়াকে প্রাথমিকভাবে বৈধ ঘোষণা করা হলেও তার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে ইসিতে আপিল করে একই আসনের সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের কাজি নুরে আলম সিদ্দিকি। আপিলকারীর পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য ও গফুর ভূঁইয়ার বিদেশী পাসপোর্টের কপি উপস্থাপন করা হয়। এমনকি গফুর ভূঁইয়া নিজেও সেটি স্বীকার করেছেন বলে শুনানিতে উপস্থিত রিটার্নিং অফিসারও সাক্ষ্য দেন।
এছাড়া শুনানির শেষ দিনে চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিল করেছে ইসি। তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি হওয়ার আপিল করেছিলেন একই আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. নুরুল আমিন।
এছাড়া কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের আবেদন স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে দীর্ঘ শুনানির পর ইসির আপিল বোর্ড এ সিদ্ধান্ত দেয় যে আগামীকাল তারা জানাবে যে কায়কোবাদের প্রার্থিতা রাখা হবে কিনা। এর আগে একই আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. ইউসুফ সোহেল রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আবেদন করেছিলেন। কায়কোবাদের বিরুদ্ধে তুরস্কের নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগ করা হয় ইসিতে।
শেষ দিনের আপিল শুনানি শেষে ঋণখেলাপির একাধিক অভিযোগ থাকা চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী এবং ফেনী-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নের বৈধতা বহাল রাখে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে শেষদিন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী। এর আগে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। একই কারণ দেখিয়ে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলে তিনি ইসিতে আপিল আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে তার আপিল আবেদন নামঞ্জুর করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
অন্যদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ প্রার্থীরই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জামায়াতের ঢাকা-২ আসনের কর্নেল (অব.) আব্দুল হক এবং কুমিল্লা-৩ আসনের ইউসুফ হাকিম সোহেল—দুজনের মনোনয়নপত্রই রিটার্নিং কর্মকর্তারা প্রথমে বাতিল করেছিলেন। তবে আপিল শুনানিতে তারা বৈধতা ফিরে পান এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত হয়।
এছাড়া বাতিল হওয়া জামায়াতের প্রভাবশালী প্রার্থীদের মধ্যে কক্সবাজার-২ আসনে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, যশোর-২ আসনে ডা. মোসলেহ উদ্দিন, গাইবান্ধা-১ আসনে মাজেদুর রহমান মাজেদের প্রার্থিতা আপিল-শুনানিতে বৈধ ঘোষণা করা হয়।
আপিল শুনানিতে যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তারা প্রার্থিতা ফিরে পেতে চাইলে এখন যেতে হবে উচ্চ আদালতে। কিন্তু আরপিওর বিধান বলছে, মনোনয়নসংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। মনোনয়নপত্র বাতিল ও আপিল খারিজের পর উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ যেকোনো প্রার্থীরই থাকে। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীও উচ্চ আদালতে আপিলের কথা জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী সময়সূচির মধ্যে ফলাফল না-ও পাওয়া যেতে পারে। কারণ, নির্বাচন কমিশন এখতিয়ার-বহির্ভূতভাবে ও ব্যক্তির প্রতি চরম অন্যায় করেছে—এমন প্রমাণ তুলে ধরতে না পারলে আদালত সাধারণত ইসির সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেন না।
এখন পর্যন্ত মোট বৈধ প্রার্থী রয়েছেন ২ হাজার ২৫৩ জন। ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় রয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আর ভোট গ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।
আপিল শুনানির শেষ দিনে ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি (জাপা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঘিরেও ছিল উল্লেখযোগ্য আইনি ও প্রশাসনিক নাটকীয়তা। বিগত নয়দিনে ইসিতে আপিল শুনানিতে এসব দল ও প্রার্থীদের বৈধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের অধিকাংশ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল মূলত স্বাক্ষরসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে। অভিযোগ ছিল, মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর স্বাক্ষর ও দাখিলকৃত হলফনামার স্বাক্ষরের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। এ নিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ অভিযোগ করেন, ‘আইনের অতিব্যবহার’ করে তাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নতুন এফিডেভিট ও ব্যাখ্যা সংবলিত আবেদন জমা দিলে নির্বাচন কমিশন অধিকাংশ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে। দলটির একাধিক প্রার্থী আপিলে বৈধতা ফিরে পাওয়ায় ইসলামী আন্দোলন এখন প্রায় সব আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাচ্ছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বড় অংশই প্রাথমিকভাবে বাদ পড়েন ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত সমর্থনপত্র জমা না দেয়া বা ভুল তথ্য দেয়ার কারণে। তবে আপিল শুনানিতে নির্বাচন কমিশন ব্যতিক্রমী নমনীয়তা দেখায়। কমিশন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে স্বাক্ষর যাচাই করে—প্রতিটি প্রার্থীর দেয়া তালিকা থেকে কয়েকজনকে ফোন করে যাচাই করে। যেসব প্রার্থীর তালিকা থেকে দুয়েকজন সমর্থককে ফোনে পাওয়া গেছে, তাদেরই প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়। এ পদ্ধতিতে অন্তত ৫০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী আপিলে বৈধতা ফিরে পান, যা নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
জাপা প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিলের হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম। যেসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল, তাদের বেশির ভাগই আপিলে বৈধতা ফিরে পান। ফলে জাপা প্রায় পূর্ণ শক্তিতেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে।
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারাসহ ৫১ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপির এমএ হান্নানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী এসকে একরামুজ্জামানের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে কমিশন। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে বগুড়া-২ আসনে রয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। এর আগে ঢাকা-১৮ আসনে তার মনোনয়নপত্র বৈধ হলেও বগুড়া-২ আসনে (শিবগঞ্জ) তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। মাগুরা-১ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পান গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান। এছাড়া বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের মধ্যে খেলাফত মজসিলের আটজন, জাতীয় পার্টির সাত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুই, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দুজন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।


