বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা উন্মোচন করবে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত —প্রধান বিচারপতি
ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
এনসিপিসহ ৩ দল নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’
ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা উন্মোচন করবে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত —প্রধান বিচারপতি
ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
এনসিপিসহ ৩ দল নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’
ডিসেম্বর ৭, ২০২৫

আবাদ হয় না বরিশাল বিভাগের সাড়ে ছয় লাখ হেক্টর জমিতে

কৃষিভিত্তিক বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি থেকে ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। মৌসুমি জলাবদ্ধতা, প্রকৃত কৃষকের জমির মালিকানা সংকট, শ্রমিক সংকট থেকে শুরু করে ভাগাভাগির দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে বছরের বিভিন্ন সময় বিভাগের সাড়ে ছয় লাখ হেক্টরের বেশি ফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকে।

কৃষিভিত্তিক বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি থেকে ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। মৌসুমি জলাবদ্ধতা, প্রকৃত কৃষকের জমির মালিকানা সংকট, শ্রমিক সংকট থেকে শুরু করে ভাগাভাগির দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে বছরের বিভিন্ন সময় বিভাগের সাড়ে ছয় লাখ হেক্টরের বেশি ফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। কৃষি গবেষক ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, উর্বর এ জমিগুলো উৎপাদনে না আসায় কৃষকের আয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো বিভাগে বর্তমানে তিন কৃষি মৌসুমে অনাবাদি জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৫৬ হেক্টর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৯১ হেক্টর জমি খরিপ-১ (মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি) মৌসুমে অনাবাদি থাকে। খরিপ-২ (মধ্য জুলাই থেকে মধ্য অক্টোবর) মৌসুমে অনাবাদি থাকে ৫২ হাজার ১৭৯ হেক্টর জমি। আর রবি (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য মার্চ) মৌসুমে পতিত থাকে ৫০ হাজার ১৮৬ হেক্টর জমি।

বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে বরিশাল জেলায় অনাবাদি জমি রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৭৩৩ হেক্টর। এর মধ্যে খরিপ-১ মৌসুমে ৯৭ হাজার ১৪৬ হেক্টর, খরিপ-২ মৌসুমে ২৮ হাজার ৮৩৭ হেক্টর ও রবি মৌসুমে মাত্র ২ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকে।

ঝালকাঠিতে অনাবাদি জমির পরিমাণ ৫১ হাজার ৬৪৯ হেক্টর। তার মধ্যে খরিপ-১ মৌসুমে ৩৪ হাজার ৯৪১ হেক্টর, খরিপ-২ মৌসুমে ২ হাজার ৩৯৮ হেক্টর এবং রবি মৌসুমে ১৪ হাজার ৩১০ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকে।

পিরোজপুরে রয়েছে ৮৪ হাজার ৮৫৫ হেক্টর পতিত জমি। খরিপ-১ মৌসুমে ৬১ হাজার ৬৭৬ হেক্টর, খরিপ-২ মৌসুমে ১০ হাজার ৫৮৩ হেক্টর এবং রবি মৌসুমে ১২ হাজার ৫৯৬ হেক্টর অনাবাদি থাকে।

পটুয়াখালী জেলায় অনাবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৪ হেক্টর। তার মধ্যে খরিপ-১ মৌসুমে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর, খরিপ-২ মৌসুমে ৬৩১ হেক্টর এবং রবি মৌসুমে ৯ হাজার ৮০৩ হেক্টর জমি পতিত থাকে।

বরগুনায় অনাবাদি জমির পরিমাণ ৮০ হাজার ৯৫৫ হেক্টর। এর মধ্যে খরিপ-১ মৌসুমে ৬৪ হাজার ৯৯৮ হেক্টর, খরিপ-২ মৌসুমে ৫ হাজার ২৩০ হেক্টর ও রবি মৌসুমে ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকে।

ভোলা জেলায় অনাবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ২১ হাজার ৮৮০ হেক্টর। খরিপ-১ মৌসুমে ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৮০ হেক্টর এবং খরিপ-২ মৌসুমে প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকে। তবে রবি মৌসুমে সেখানে কোনো জমি অনাবাদি থাকে না।

বিভাগের একাধিক কৃষি কর্মকর্তার মতে, অনেক প্রকৃত কৃষকের নিজস্ব জমি নেই। তারা বর্গায় জমি চাষ করে থাকেন। মালিকের সঙ্গে ফসলের ভাগ নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় ফসলের মৌসুমে জমি ফাঁকা পড়ে থাকে। এছাড়া শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, বীজ ও সারসহ কৃষি উপকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অনেকে কৃষিজীবী পেশা ছেড়ে বিকল্প উপার্জনে ঝুঁকছেন। ফলে জমির বড় অংশ অনাবাদি থাকে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন ও বন্যা, প্রাকৃতিক বাধায় থমকে যায় চাষাবাদ। বরিশাল কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা বিন রফিক বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও বরিশাল অঞ্চলে অনাবাদি জমির পরিমাণ আরো বেশি ছিল। কৃষি অফিসের মাঠপর্যায়ের নজরদারি, চাষাবাদে উৎসাহ এবং কৃষিসেবামূলক পরামর্শের মাধ্যমে জমির একটি অংশ চাষের আওতায় এসেছে। তবে বর্তমানে যে জমি অনাবাদি রয়েছে তার সিংহভাগই প্রাকৃতিক কারণভিত্তিক। নিচু জমিতে পানি জমে থাকা, নদীভাঙনের মুখে থাকা বা ঘাসজাতীয় কণ্টকাকীর্ণ উদ্ভিদের বিস্তারের কারণে জমিতে চাষ করা যায় না।’ সময়ের সঙ্গে এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল পরিমাণ অনাবাদি জমি বরিশাল বিভাগের কৃষি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। ধান, ডাল, তেলবীজ বা শাকসবজির সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কৃষকের আয় কমছে এবং বাজারে চাপ বাড়ছে। এছাড়া স্থানীয় খাদ্যশস্যের ঘাটতি পূরণে বাইরে থেকে পণ্য আনতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে নির্ভরশীল করে তুলছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বর্গা ব্যবস্থার সংস্কার, ঋণ সহজীকরণ ও প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণে পদক্ষেপ নেয়া গেলে বরিশালের বিশাল অনাবাদি জমি আবারো উৎপাদনমুখী হতে পারে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা বিন রফিক বলেন, ‘আগে বরিশাল অঞ্চলে অনাবাদি জমির পরিমাণ আরো বেশি ছিল। কৃষি অফিসের বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরামর্শে এ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।’

বর্তমানে বিভাগের যে জমিগুলো অনাবাদি পড়ে রয়েছে তার অধিকাংশই প্রাকৃতিক কারণে। এর মধ্যে রয়েছে নিচু জমিতে পানি জমে থাকা, নদীভাঙনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, ঘাসজাতীয় উদ্ভিদে আচ্ছাদিত জমি ইত্যাদি। এসব কারণে কৃষকরা চাষাবাদে এগোতে পারেন না।’

তিনি আশা প্রকাশ করেন, কৃষক ও কৃষি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আগামী মৌসুমগুলোতে অনাবাদি জমির পরিমাণ আরো কমবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশাল অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মাদ নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ না হলেও ৯৯ ভাগ পূরণ হচ্ছে। তবে জমি অনাবাদি থাকার অন্যতম কারণ কৃষক ও জমির মালিকের মধ্যকার বিষয়। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতাও এর জন্য অনেকটা দায়ী। আমরা কৃষকদের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে কাজ করছি, যাতে একখণ্ড জমিও অনাবাদি না থাকে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *