
মুক্তি পাচ্ছে ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর নতুন ৮ পর্ব
অক্টোবর ৯, ২০২৫
পাঁচ দফা দাবি আদায়ে জামায়াতের ২ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা
অক্টোবর ৯, ২০২৫প্রতিবেদক, সিটি নিউজ সেভেন (ctnews7)
বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দারিদ্র্য বিমোচন ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রাণিসম্পদ খাত এক অনন্য ভূমিকা পালন করছে। দেশের একটি অন্যতম প্রধান উন্নয়নমুখী খাত হিসেবে প্রাণিসম্পদ এখন অর্থনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৫ লাখ প্রান্তিক খামারি দুই-তিনটি করে পশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আরও প্রায় আট লাখ খামারি গবাদিপশু লালন-পালন করেন। দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে যুক্ত। শুধু পোলট্রি শিল্পেই নিয়োজিত আছেন প্রায় ৬০ লাখ মানুষ, যার মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতের জিডিপিতে অবদান ১.৮১ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার ৩.১৯ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ১৬.৫৪ শতাংশ। বর্তমানে দেশে রয়েছে প্রায় আড়াই কোটি গরু, ১৫ লাখ মহিষ, তিন কোটি ছাগল-ভেড়া এবং ৪০ কোটি হাঁস-মুরগি। এসব গবাদিপশু থেকে বছরে প্রায় ১৫৫ লাখ টন দুধ, ৮৯.৫৪ লাখ টন মাংস ও ২ হাজার ৪৪০ কোটি ডিম উৎপাদন হয়।
প্রান্তিক খামারিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, বাচ্চা সরবরাহ, খাদ্য, ভ্যাকসিন ও ওষুধ প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। বর্তমানে পোলট্রি শিল্প গার্মেন্টসের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান খাতে পরিণত হয়েছে। এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
দেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন পোলট্রি ও ডেইরি ফিড উৎপাদন হয়, এবং নিবন্ধিত ফিড মিলের সংখ্যা ৩৪২। এসব খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকরভাবে মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন-২০১০ ও বিধিমালা-২০১৩ অনুসরণ করা হচ্ছে।
ডেইরি খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৮৬ লাখ দুগ্ধবতী গাভীর মাধ্যমে দেশের মোট দুধ উৎপাদনের ৭০ শতাংশ আসে প্রান্তিক ও নারী খামারিদের কাছ থেকে। জাত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর প্রায় ১৭ লাখ উন্নত জাতের বাছুর উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়নে রেড চিটাগাং ক্যাটেল, মীর কাদিম, পাবনা, নর্থ বেঙ্গল গ্রে ও নেত্রকোনা ব্ল্যাক জাতের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উপকূলীয় অঞ্চল ও হাওরাঞ্চলে মহিষ প্রজনন কর্মসূচি চালু রয়েছে। সরকারি তিনটি মহিষ উন্নয়ন খামার থেকে নিয়মিতভাবে খামারিদের মাঝে মহিষের বাচ্চা সরবরাহ করা হচ্ছে।
রোগবালাই নিয়ন্ত্রণেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রতি বছর প্রায় ৩৪ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়। সম্প্রতি লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) প্রতিরোধে ১৭ লাখ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। ক্ষুরা রোগ (এফএমডি) মুক্ত অঞ্চল তৈরির লক্ষ্যে চারটি জেলায় টিকাদান কার্যক্রম চলছে। এছাড়া ছাগলের মারাত্মক সংক্রামক পিপিআর রোগ নির্মূলে ছয় কোটি ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জুনোটিক রোগ প্রতিরোধে ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে এবং দেশের জল, স্থল ও বিমানবন্দরে ২৪টি কোয়ারেন্টাইন স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানাও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত হয়। এখানে ১৩৫ প্রজাতির ৩,৩২৫টি প্রাণী রয়েছে, যা বছরে প্রায় ৪০-৪৫ লাখ দর্শনার্থী আকর্ষণ করে এবং প্রায় ১৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়।
নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর কাছে স্বল্পমূল্যে প্রাণিজ আমিষ সরবরাহের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের রমজানে ৪৯৫টি ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে দুধ, মাংস ও ডিম বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়, যার মোট মূল্য ছিল ৩১ কোটি টাকারও বেশি।
🔹 উপসংহার:
প্রাণিসম্পদ খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় ও গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহার, রোগনিয়ন্ত্রণ এবং তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি—সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদের অবদান ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।


