সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে অংশ নেবে না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
হাসপাতালে চাপ বেড়েছে জ্বর নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগীর
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে অংশ নেবে না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
হাসপাতালে চাপ বেড়েছে জ্বর নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগীর
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এক-তৃতীয়াংশের নেই নিজস্ব আয়, সরকারের ভর্তুকিতে মেটানো হচ্ছে বেতন-ভাতা

২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া ১৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৮টিরই নিজস্ব কোনো আয় ছিল না। অর্থাৎ পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া প্রতি দুই প্রতিষ্ঠানের প্রায় একটির নিজস্ব আয় নেই। অন্যদিকে বাকি ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় ছিল মাত্র ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা।
ঢাকা লেদার কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির উদ্দেশ্যে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিটির যাত্রা শুরু হয়। যদিও কাঁচামাল সংকটে চালুর মাত্র ছয়দিন পরই কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯৯৮ সাল থেকে ঢাকা লেদারের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এখনো পরিশোধ করা হচ্ছে সরকারি অর্থে।
একই চিত্র ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডেরও। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে সেখানে উৎপাদন বন্ধ। গত এক দশকে কারখানাটি সংস্কারে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি কোম্পানিটি। ভারতের মেঘালয় থেকে চুনাপাথর এনে উৎপাদন চালুর উদ্যোগও এক রকম থমকে আছে। অথচ একই এলাকায় বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম ভারত থেকে চুনাপাথর এনে ক্লিংকার উৎপাদনের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
শুধু ঢাকা লেদার কিংবা ছাতক সিমেন্ট নয়, এ ধরনের আরো অনেক অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও করপোরেশন রয়েছে, যেগুলোর পরিচালন কার্যক্রম থেকে কোনো আয় নেই। উল্টো এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে প্রতি বছর সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সরকার নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করায় বেতন-ভাতা খাতে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয় দ্বিগুণ হবে।
সরকারি কর্মচারী বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোয় কর্মরত কর্মচারীর সংখ্যা ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৮৭। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৩০। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি বাবদ ৮৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির নাজুক চিত্র উঠে এসেছে অর্থ বিভাগের একাধিক প্রতিবেদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া ১৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৮টিরই নিজস্ব কোনো আয় ছিল না। অর্থাৎ পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া প্রতি দুই প্রতিষ্ঠানের প্রায় একটির নিজস্ব আয় নেই। অন্যদিকে বাকি ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় ছিল মাত্র ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা।
এদিকে ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন করে অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। অন্যদিকে আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে ২৪টি প্রতিষ্ঠান। দুই তালিকাতেই রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১২। ফলে অতি উচ্চ ঋণ ঝুঁকি ও আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত—দুই শ্রেণীতে মোট ৩১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত জনবলের সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার।
 ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান কৌশলগত কারণে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন। এর বাইরে যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেগুলো ছেড়ে দেয়া বা বন্ধ করে দেয়া উচিত। সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা কেবল প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখলে প্রতি বছর বেতন-ভাতা, অবসরকালীন সুবিধাসহ নানা ধরনের ব্যয় বহন করতে হয়। এতে সরকারের বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ অকার্যকর ও লোকসানি।’
বিশ্বের অনেক দেশ কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এ ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা পুনর্গঠন করতে পেরেছে, আবার অনেক দেশ পারেনি উল্লেখ করে মাহবুব আহমেদ আরো বলেন, ‘এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। উন্নয়নশীল অনেক দেশেই রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গবেষণা করেছে এবং সংস্কারের সুপারিশ দিয়েছে।’
লোকসানি ও আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রতি বছর সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে এ ব্যয়ের চাপ আরো বাড়বে। উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে সরকারকে। এতে রাষ্ট্রের বাজেটের ওপর বাড়ছে চাপ, অন্যদিকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার বা পুনর্গঠনের পরিবর্তে বছরের পর বছর একই কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠানই সরকারের জন্য আর্থিক রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এগুলো নিয়ে সামগ্রিকভাবে একটি সংস্কার পরিকল্পনা করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দিয়ে দেয়া যেতে পারে, কোনোটি সরকারি মালিকানায় রেখে ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দেয়া যেতে পারে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোড করা যেতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল জমি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে, সেগুলো কীভাবে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা বিবেচনা করতে হবে। তবে জমি বা সম্পদ বেসরকারি খাতে দেয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি যেন পরবর্তী সময়ে শুধু রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ব্যবহৃত না হয়।’
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের ইস্যুটি সরকারের জন্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সাশ্রয়ী হতে হবে। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য কার্যকর সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।’
অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। এ তালিকায় রয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, ইস্টার্ন টিউবস লিমিটেড, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড, জয়পুরহাট সুগার মিলস লিমিটেড, খুলনা ওয়াসা, কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড, মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর সুগার মিলস লিমিটেড, পাবনা সুগার মিলস লিমিটেড, রাজশাহী সুগার মিলস লিমিটেড, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড, ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস লিমিটেড, জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেড ও টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড।
দেশের টেলিকম খাতে প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড। গ্রাহক সংখ্যা ও আয়ের দিক দিয়ে টেলিটকের অবস্থান সবার পেছনে। অর্থ বিভাগের মূল্যায়নেও অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকায় রয়েছে টেলিটক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ১৫৫ কোটি টাকা।
, ‘নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মান বাড়াতে প্রতিনিয়ত প্রচুর ইনভেস্টমেন্টের প্রয়োজন হয়, যা পেতে সরকার চেষ্টা চালাচ্ছে। অনেকগুলো নতুন প্রকল্পও পাইপলাইনে রয়েছে। পর্যাপ্ত সরকারি বিনিয়োগ ছাড়া অন্য অপারেটরদের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়। যেখানে অন্য অপারেটরদের ২২ হাজার বিটিএস (টাওয়ার) রয়েছে, সেখানে টেলিটকের রয়েছে মাত্র ছয় হাজার বিটিএস। টেলিটক সরকারি নির্দেশনা মেনে সাধারণ মানুষকে অন্যান্য অপারেটরের চেয়ে তিন ভাগ কম খরচে ইন্টারনেট ও ভয়েস সেবা দিয়ে আসছে। অন্যান্য বাণিজ্যিক অপারেটরের মতো কেবল মুনাফাভিত্তিক না হয়ে টেলিটককে সরকারের বিভিন্ন সামাজিক ও সরকারি নীতিগত বাধ্যবাধকতা (কমপ্লায়েন্স) পূরণ করতে হয়। সরকারি কোনো ভর্তুকি না পেয়েও প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব আয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে।’
গত দুই-তিন বছরে টেলিটকের আর্থিক অবস্থার উত্তরোত্তর উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কোম্পানির লোকসানের পরিমাণ কমে ১০০ কোটি টাকার নিচে (প্রায় ৭০ কোটি টাকা) নেমে এসেছে। মূলত সম্পদের অবচয় (ডিপ্রিসিয়েশন) ও অ্যামোরটাইজেশনের কারণেই এ ক্ষতি হিসাবভুক্ত হয়।’
নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে টেলিটক ভবিষ্যতে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে এবং সরকারকে মুনাফার অংশ দিতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৪, এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়ও রয়েছে। শুধু আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড, ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড, ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড, গাজী ওয়্যারস লিমিটেড, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ, রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড, সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। এসব প্রতিষ্ঠানের নিট আয়, পরিচালন মুনাফা ও পরিচালন নগদ প্রবাহ—তিনটিই নেতিবাচক। ফলে নিজেদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ভর্তুকি, অনুদান অথবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিপুল অর্থ ব্যয়ে সরকার ৩৯টি হাই-টেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ করেছে। তবে এসব পার্ক থেকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি আসেনি। ফলে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের আর্থিক দুরবস্থাও প্রকট হয়ে উঠেছে। আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১৮ কোটি টাকার লোকসান করেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আর্থিকভাবে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ লোকসানে থাকার কারণ এখানকার বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। বিগত সরকার হয়তো এগুলোতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু সেগুলো বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। এখন পর্যন্ত যশোর, চট্টগ্রাম ও নাটোরের তিনটি পার্ক ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়নি। বিদ্যমান পার্ক ও যেগুলো নির্মাণাধীন রয়েছে, সেগুলোতে কীভাবে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় ও বাস্তবসম্মত করা যায়, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলোই মূলত আর্থিকভাবে লোকসানে থাকার কারণ।’
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে এ রকম অনেক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের কাঠামোগত ও আর্থিক ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের বেশকিছু বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছর সরকারের জাতীয় বাজেট থেকে ভর্তুকি, অনুদান বা ঋণের মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়, যা সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নেয়া ঋণের বিপরীতে সরকার ‘সার্বভৌম গ্যারান্টি’ প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা সরাসরি সরকারের ঘাড়ে চাপে, যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় অদৃশ্য ঝুঁকি। এ অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে সামগ্রিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষাতেও। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত লোকসান দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ভর্তুকি, উন্নয়ন সহায়তাসহ এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের মোট নিট আর্থিক সহায়তা বেড়ে প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের পাশাপাশি এগুলোকে সচল রাখতে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক দায় তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সুশাসন সংকটের কথাও উঠে এসেছে। খণ্ডিত আইন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবকে দুর্বল পারফরম্যান্সের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ সবচেয়ে বেশি। সংকট উত্তরণে বাণিজ্যিকভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, আর্থিক তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং একচেটিয়া খাতে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা চালুর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়—এমন প্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে বেসরকারীকরণ বা বন্ধ করার পরামর্শও দেয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *