ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম কমল ২২১৬ টাকা
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
যাত্রাবাড়ীতে ক্রোকারিজ ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ, একজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম কমল ২২১৬ টাকা
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
যাত্রাবাড়ীতে ক্রোকারিজ ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ, একজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬

ডেঙ্গুর ধরনে পরিবর্তন পাচ্ছেন চিকিৎসকরা

জ্বর ভালো হওয়ার পর হঠাৎ প্লাটিলেটে অবনতি, বিকল হচ্ছে কিডনি-লিভার
রাজধানীর মিরপুরের আবু বকর সিদ্দিক পিন্টু। তিনদিন ধরে জ্বরে ভোগার পর গত জুলাইয়ের শেষ দিকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তখন তার প্লাটিলেট ছিল দেড় লাখের মতো। কিন্তু মাত্র একদিনের ব্যবধানে তা নেমে আসে ১৫ হাজারে। এরপর দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। প্রথমে লিভার ও পরে কিডনি বিকল হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ৪০ বছরের এ যুবক।
শুধু আবু বকর নন, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে একই ধরনের কিছু জটিল অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকরা। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবারের ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে উপসর্গের ধরন ও রোগের গতিপ্রকৃতিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অনেক রোগীর শুরুতে জ্বর তুলনামূলকভাবে মৃদু থাকছে। ফলে সাধারণ ভাইরাল জ্বর, ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারছেন না অনেকে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, মৃদু উপসর্গের কারণে অনেক রোগী শুরুতে হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছে। কেউ কেউ জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থ হওয়ার লক্ষণ মনে করে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরছে। অথচ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার সময়টিই অনেক সময় সংকটাপন্ন হওয়ার পর্যায় হতে পারে। ফলে রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটলে হাসপাতালে নেয়ার আগেই তৈরি হচ্ছে জটিলতা। কোনো কোনো রোগীর প্লাটিলেট অল্প সময়ের মধ্যে বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট, লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় প্রয়োজন পড়ছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সেবার। এতে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দিয়ে রোগীর অবস্থা বিচার করা ঠিক নয়। রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্তের ঘনত্ব, লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা এবং অন্যান্য শারীরিক উপসর্গও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীর শারীরিক অবস্থায় আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।
চলতি বছর ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাজধানীর বারিধারার মাদানী হাসপাতাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফারাজী হাসপাতালের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. ইব্রাহিম মাসুম বিল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছরই ডেঙ্গুর উপসর্গ ও রোগের ধরনে কিছু না কিছু পরিবর্তন লক্ষ করছি। ফলে চিকিৎসক হিসেবে আমাদেরও প্রতিনিয়ত নিজেদের আপডেট রাখতে হচ্ছে। গত বছর এমন অনেক রোগী দেখেছি, যাদের ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হলেও প্লাটিলেট কম ছিল। তখন রোগীর উপসর্গ ও ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতি বিবেচনা করে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা মাথায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছে।’
এ বছরের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো অনেক রোগীর জ্বর খুব তীব্রভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না। ফলে জ্বর হলে অনেকেই তিন-চারদিন বাসায় অপেক্ষা করছে এবং পরীক্ষা করাচ্ছে না। গতকালও (শুক্রবার) এমন একজন রোগী পেয়েছি, যিনি অপেক্ষা করতে করতে একেবারে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সৌভাগ্যক্রমে বর্তমানে তার অবস্থা উন্নতির দিকে। গত সপ্তাহেও ২৫ বছর বয়সী এক তরুণ ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। তিনিও দেরিতে হাসপাতালে এসেছিলেন।’
হাসপাতালে যাওয়ার মতো তীব্র জ্বর অনুভূত না হওয়ায় অনেকেই চিকিৎসা নিতে দেরি করছে জানিয়ে এ চিকিৎসক বলেন, ‘অথচ এর মধ্যেই রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত জটিল হয়ে যেতে পারে। তাই তীব্রতা কম হলেও ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বরকে অবহেলা করা যাবে না। সময়মতো পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি রোগীর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
জুরাইনের মেয়ে তাবিয়া তাবাসুসম। প্রায় ১০ দিন ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করে গতকাল ধানমন্ডির একটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ১১ বছরের এ শিশু। তার পরিবার জানায়, শুরুতে জ্বর তীব্র না হওয়ায় বাড়িতেই চিকিৎসা চলছিল। একসময় জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু তার আগেই প্লাটিলেট ও রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। অবস্থার অবনতি হলে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা সবচেয়ে দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে জ্বর কমে যাওয়ার পর। প্লাটিলেট কমার পাশাপাশি রক্তনালির ভেতর থেকে প্লাজমার তরল অংশ বেরিয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পর সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় শুরু হয়। এ সময়ে ভাইরাস ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে রক্তে প্লাটিলেট দ্রুত কমতে থাকে, যা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এর চেয়েও মারাত্মক সমস্যা হলো প্লাজমা লিকেজ। রক্তনালি থেকে তরল অংশ বের হয়ে রক্ত ঘন হয়ে যায় এবং পেটে বা ফুসফুসে পানি জমে। এতে রোগী রক্তচাপ হঠাৎ কমে গিয়ে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে চলে যেতে পারে। এ সময়ে তীব্র পেটে ব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা দেখা দিতে পারে শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ। কিন্তু জ্বর কমে যাওয়ায় অনেক রোগী কিংবা স্বজন বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসা এবং আইসিইউতে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।’
এদিকে ডেঙ্গুতে নতুন করে ২৪ ঘণ্টায় আরো দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৮৮ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ জনে। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪১ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের গতকালের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) চিকিৎসা ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে। ঢাকায় গত বছর সেরোটাইপ-২ ও সেরোটাইপ-৩-এর সংক্রমণ ছিল, যার মধ্যে সেরোটাইপ-২ আক্রান্ত রোগী বেশি ছিল। এ বছর আগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অন্য সেরোটাইপে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ডেঙ্গুতে এখন প্লাটিলেট কমার বিষয়টির চেয়ে রক্তচাপ কমে যাওয়া বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। যাদের অবস্থা হঠাৎ অবনতি হচ্ছে, তারা অনেক সময় দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত রোগী। প্রথমবার আক্রান্ত হলে অনেক সময় বিষয়টি বোঝা যায় না। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে অল্প সময়ের মধ্যেই জ্বর ভালো হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ভেতরে রক্তপাত চলতে থাকে।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের রক্তপাত কিডনি, লিভার কিংবা অন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে হতে পারে। রক্তপাত চলতে থাকলে একপর্যায়ে রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তখন হাসপাতালে নিতে দেরি হলে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। তাই জ্বর হলে এক-দুইদিন অপেক্ষা না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দেন এ চিকিৎসা বিজ্ঞানী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *