শিক্ষার্থীর মৃত্যু
আগস্ট ১৫, ২০২৬
হরমুজ প্রণালিকে শিগগিরই মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা করতে যাচ্ছি: ট্রাম্প
আগস্ট ১৫, ২০২৬
শিক্ষার্থীর মৃত্যু
আগস্ট ১৫, ২০২৬
হরমুজ প্রণালিকে শিগগিরই মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা করতে যাচ্ছি: ট্রাম্প
আগস্ট ১৫, ২০২৬

দ্রুত উজাড় হচ্ছে সিলেট অঞ্চলের বন আশ্রয় ও খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে বন্যপ্রাণী

সিলেটের পাহাড়ি বনাঞ্চল দ্রুত উজাড় হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও খাদ্যশৃঙ্খল। ফলে আশ্রয় ও খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসছে বন্যপ্রাণী।

বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চা-বাগান এবং আশপাশের বসতিতে সাপের উপদ্রব মারাত্মকভাবে বেড়েছে। গভীর বনের নিরাপদ পরিবেশ হারিয়ে লোকালয়ে ঢুকছে বিশালাকৃতির অজগরসহ নানা প্রজাতির বিষধর সাপ। শুধু জুন ও জুলাইতেই মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে অন্তত ১০টি বিশালাকৃতির অজগর। এছাড়া হাতি, গন্ধগোকুল, বিরল প্রজাতির বানর, হনুমানসহ নানা বন্যপ্রাণী লোকালয়ে ধরা পড়ছে। বন উজাড় ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় বিপন্ন হচ্ছে এ অঞ্চলের অনন্য জীববৈচিত্র্য।

সিলেট বিভাগের পাহাড়ি ও সীমান্তবেষ্টিত জেলাগুলোয় বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে চলে আসার ঘটনা এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বসতবাড়ি, হাঁস-মুরগির খামার কিংবা বাঁশঝাড় থেকে প্রতিনিয়ত সাপ উদ্ধার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি ও ভিডিও নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। তবে এ সংকট বেশি প্রকাশ পাচ্ছে মৌলভীবাজার জেলায়।

একসময় শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ছিল বন্যপ্রাণীর অন্যতম নিরাপদ প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল। কিন্তু বর্তমানে তা বনের বাসিন্দাদের পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ বাসস্থান দিতে পারছে না। ফলে দীর্ঘদিনের চেনা বন ছেড়ে ১২ থেকে ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং ২০-৩০ কেজি ওজনের বিশালাকৃতির অজগর চা-বাগান, গৃহপালিত প্রাণীর খামার এমনকি হাইল হাওরের বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বন বিভাগ ও স্থানীয় উদ্ধারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন ও জুলাইয়ে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ থেকে অন্তত ১০টি বিশালাকৃতির অজগর উদ্ধার হয়েছে। জুনে শ্রীমঙ্গলের লোকালয় থেকে চারটি অজগর উদ্ধার করা হয়। এরপর জুলাইয়ে উদ্ধার অভিযান আরো বাড়ে। ৯ জুলাই ভূরভূড়িছড়া চা-বাগান থেকে একটি অজগর ধরা পড়ে। ১৬ জুলাই ভাড়াউড়া চা-বাগান ও সিন্দুরখান এলাকা থেকে পৃথক দুটি অজগর মেলে। ২১ জুলাই উত্তর ভাড়াউড়া থেকে উদ্ধার হয় একটি অজগর। ২৮ জুলাই শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা-বাগান ও কমলগঞ্জের ফুলবাড়ী চা-বাগান থেকে পৃথক দুটি বিশালাকৃতির অজগর উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ ৬ আগস্ট শ্রীমঙ্গলে পরিত্যক্ত মাছ ধরার জালে আটকে থাকা একটি মুমূর্ষু অজগর উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর সাপগুলোকে সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী-বিষয়ক সংগঠন ‘প্রাধিকার’-এর সভাপতি মোহাম্মদ শাহীন আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও খাদ্যশৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। অজগর প্রকাশ্যে আসার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, গাছপালা কেটে ফেলার কারণে বাসস্থান সংকুচিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বনে তীব্র খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ায় প্রাণীগুলো খাবারের খোঁজে লোকালয়ে আসছে। তৃতীয়ত, অজগর সাধারণত গর্তে হাইবারনেশন বা সুপ্তাবস্থায় থাকে। তবে অতিরিক্ত গরমের কারণে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে এরা গর্ত ছেড়ে বাইরে বের হয়ে আসছে।’

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ভূমি সন্তান সিলেট’-এর সংগঠক শুয়াইব হাসান বলেন, ‘বন উজাড়, ফলদ গাছ নিধন এবং পাহাড়ি ছড়া ও গর্ত ধ্বংসের কারণে সাপের প্রাকৃতিক আবাস বিলীন হচ্ছে। অবিলম্বে অবৈধ বন দখল বন্ধ, বনের ভেতর থেকে স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল পুনরুদ্ধার এবং বন্যপ্রাণীর জন্য নিরাপদ করিডোর তৈরি না করলে সিলেটের অনন্য জীববৈচিত্র্য চিরতরে হারিয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত সীতেশ রঞ্জন দেবের ছেলে ও সংগঠনের অর্থ সচিব সঞ্জিত দেব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লাউয়াছড়া বনের মধ্য দিয়ে সড়ক ও ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথ তৈরি হয়েছে। ফলে বনের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার সময় প্রায় প্রতিদিনই ট্রেন ও দ্রুতগতির গাড়ির নিচে পিষ্ট হয়ে সাপ, গন্ধগোকুল, বানরসহ বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী মারা পড়ছে।’

তিনি আরো জানান, গত পাঁচ দশকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের আয়তন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। সংঘবদ্ধ দখলদারদের আগ্রাসন, অবৈধ জনবসতি, বাণিজ্যিক বাগান সম্প্রসারণ ও অবাধে গাছ কাটার ফলেই বন সংকুচিত হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে প্রাণিকুলের ওপর।

মৌলভীবাজারের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক জানান, সাম্প্রতিক অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ছড়ায় পানি বাড়ায় শুকনো আশ্রয়ের খোঁজে অজগর চা-বাগান ও লোকালয়ে আসছে। শ্রীমঙ্গল ও লাউয়াছড়ার অধিকাংশ এলাকাই হাওর ও পাহাড়ি ছড়ার সঙ্গে সংযুক্ত। আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলে এরা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে। তবে মানুষের সচেতনতাই পারে এসব প্রাণীকে রক্ষা করতে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেটের কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অজগরের মূল আবাস চা-বাগান ও পাহাড়ি ছড়াসংলগ্ন এলাকা। এসব জায়গায় খরগোশ, বনমোরগ, পাখি ও মাছের প্রাচুর্য থাকে। বর্ষাকালে তাদের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় তারা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।’

তিনি আরো জানান, সাপ শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী। এরা অতিরিক্ত শীত বা গরম সহ্য করতে পারে না। উপযুক্ত পরিবেশ পেতে তাদের রোদ ও ছায়ার প্রয়োজন হয়। চা-বাগানের হালকা ছায়াঘেরা পরিবেশ তাদের জন্য আদর্শ। তবে চা-বাগানে মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় অজগর সহজেই চোখে পড়ে। খাবারের সন্ধান ও স্বাভাবিক প্রজনন ছাড়া কোনো প্রাণীর প্রতি অজগরের কোনো আগ্রাসী উদ্দেশ্য থাকে না। সচেতনতা বাড়িয়েই মানুষের নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উভয়ই নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *