মাদকাসক্ত ছেলের হাতে মা খুন
আগস্ট ১৫, ২০২৬
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট বন্ধ
আগস্ট ১৫, ২০২৬
মাদকাসক্ত ছেলের হাতে মা খুন
আগস্ট ১৫, ২০২৬
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট বন্ধ
আগস্ট ১৫, ২০২৬

শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামেও বিক্রি হচ্ছে সিলিকা মেশানো চিংড়ি

মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সিলিকা জেলি দিয়ে বাড়ানো হচ্ছে চিংড়ির ওজন।

সেই চিংড়িতে সয়লাব ফেনীর বাজার। জেলার সর্ববৃহৎ মাছের আড়ত থেকে প্রকাশ্যে এসব বিষাক্ত মাছ চলে যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাটবাজারে, বিক্রিও চলছে দেদার। জেলি মেশানো চিংড়ি খেয়ে মানবদেহে ক্যান্সার ও কিডনি বিকলের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন ভোক্তারা। প্রশাসনের আইনি পদক্ষেপ ও জরিমানা সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না অসাধু কারবার। ভোক্তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের চালানো অভিযান অপ্রতুল। ভেজাল ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা ও নিয়মিত অভিযানের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা থেকে ফেনীতে প্রতিদিনই আসে বিভিন্ন জাতের বড় চিংড়ি। প্রতিদিন ভোরে ফেনীর সর্ববৃহৎ পৌর মাছের আড়তে চিংড়িবাহী ট্রাক থেকে দেড় থেকে দুই টন বড় জাতের চিংড়ি আনলোড করা হয়। এরপর মাছগুলো ফেনী শহরের বড় বাজার, রেলগেটসহ জেলার হাটবাজারগুলোতে চলে যায়। অভিযোগ রয়েছে, কেজিতে ১৫ পিস ও কেজিতে ১০ পিস আকারের চিংড়িগুলোতে খামার থেকেই এ বিষাক্ত জেলি পুশ করা হয়।

আড়তদাররা জানান, মুনাফালোভী খামারিরা সিলিকা পাউডার ও ভাতের মাড় মিশিয়ে ঘন আঠালো জেলি তৈরি করে। এরপর তা সিরিঞ্জের মাধ্যমে চিংড়ির মাথা ও শরীরের নরম অংশে পুশ করে। এসব মাছের মাথা ও শক্ত খোলসের সংযোগস্থলটি আলতো করে ভেঙে বা ফাঁক করে দেখলেই জেলির উপস্থিতি বোঝা যায়। প্রতি কেজি চিংড়িতে জেলি পুশ করে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজন বাড়ানো যায়।

এদিকে ফেনীর হাটবাজারে বিক্রি হওয়া চিংড়িতে জেলি মেশানোর প্রমাণ পেয়েছে প্রশাসন। বড় বাজার থেকে সম্প্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা দরে দুই কেজি চিংড়ি কেনেন এক প্রবাসী। বাড়িতে নিয়ে চিংড়ির মাথায় ও শরীরে জেলির উপস্থিতি দেখে বিচলিত হন তিনি। একপর্যায়ে তিনি এ চিংড়িগুলো নিয়ে ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হন। বিষয়টি জেলা প্রশাসক জানার পর তাৎক্ষণিক ফেনীর বড় বাজারে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে বাজারে বিক্রির জন্য তোলা সব চিংড়িতে জেলির উপস্থিতির প্রমাণ পান ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় জেলি মেশানো চিংড়ি বিক্রির দায়ে কিরণ, দীপক, আলী হোসেন ও হানিফ নামের চার মাছ বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। একই সঙ্গে ৩০ কেজি চিংড়ি জব্দ করে মাটিতে পুঁতে দেয়া হয়। ২০ জুন মাছের আড়তে অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশ ফিশিং থেকে জেলি মেশানো ৮০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা। এ ঘটনায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। সর্বশেষ ৬ আগস্ট ফেনী পৌর মৎস্য আড়তে অভিযান চালান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এ সময় মায়ের দোয়া ফিশিং থেকে জেলি মেশানো ৩৮ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়।

ভোক্তাদের অভিযোগ, শুধু ফেনী শহরের বড় বাজার বা আড়ত নয়; ফেনীর কোথাও জেলি মেশানো ছাড়া চিংড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। এ চিংড়ি খেয়ে ভোক্তাদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি নানা জটিল রোগ হলেও মৎস্য বিভাগ, ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকায় রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হলেও থাকে না ধারাবাহিকতা।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খালেদ মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চিংড়ির মাথা ও শরীরে সিলিকা জেলি পুশ করার কথা সম্প্রতি ফেনীতে খুব বেশি শোনা যাচ্ছে। সিলিকা জেলি মূলত একটা কেমিক্যাল। এটি কৃত্রিম উপাদানমিশ্রিত এক ধরনের বিষ। এ চিংড়ি খেলে মানবদেহে হজমে সমস্যা, কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস ও লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের চিংড়ি খেলে দুরারোগ্য ক্যান্সারের আশঙ্কাও থাকে। এসব জটিল রোগ থেকে বাঁচতে ভেজাল চিংড়ি খাবার টেবিল থেকে বাদ দিতে হবে।’

তবে ফেনীর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (পরশুরাম) সৈয়দ মোস্তফা জামান দাবি করেন, ফেনীর কোথাও চিংড়িতে জেলি পুশ করা হয় না। যেসব খামারে চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেসব স্থানেই মূলত অসাধু চক্র সিরিঞ্জ দিয়ে জেলি পুশ করে থাকে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মৎস্য বিভাগ জেলি মেশানো চিংড়ি বিক্রি ঠেকাতে নানা সময় অভিযান চালিয়ে মাছ জব্দ ও বিক্রেতাকে জরিমানা করছে। এ বিষয়ে মৎস্য দপ্তর সক্রিয় রয়েছে।’

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ফেনী জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট পার্থপাল চৌধুরী বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ফেনীতে প্রতিদিনই জেলিমিশ্রিত চিংড়ি আসছে। প্রশাসনকে মাঝে মধ্যে অভিযান চালাতে দেখেছি। কিন্তু মাছগুলো যে স্থান থেকে আসে ও যেখানে জেলি পুশ করা হয়, সেখানে প্রশাসনের ভূমিকা দেখা যায় না। তাই অভিযান ফলপ্রসূ হচ্ছে না। প্রয়োজনে আরো কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা নাসরিন কান্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেনীতে জেলি পুশ করা চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে—এটা সত্য। বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এটি মজুদ ও বিক্রি বন্ধ করতে অভিযান চলমান রয়েছে। আমরা এ বিষয়ে মৎস্য বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে শিগগিরই আড়তদারদের সঙ্গে বসব। সমাধান না হলে কঠোর ভূমিকা নেয়া হবে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেব না।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *