
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডেরই বিচার করা হবে
আগস্ট ৬, ২০২৬
হামের উপসর্গে প্রাণ গেল আরো পাঁচ শিশুর, মৃত্যু ছাড়িয়েছে সাড়ে আটশ
আগস্ট ৬, ২০২৬রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী প্রতি চারটি বাসের মধ্যে একটি ফিটনেস সনদ ছাড়াই যাত্রী পরিবহন করছে। সে হিসাবে প্রতিদিন লাখো যাত্রীকে নির্ভর করতে হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ এ গণপরিবহনের ওপর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্বল তদারকি, অপরিকল্পিত রুট ব্যবস্থাপনা, বাসের অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং অকার্যকর স্ক্র্যাপিং ব্যবস্থার কারণে বছরের পর বছর ধরে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে অনুমোদিত বাসের সংখ্যা ৭ হাজার ৪৩। এর মধ্যে নিয়মিত সড়কে চলাচল করছে ৪ হাজার ৫৪৬টি বাস। কিন্তু এসব সক্রিয় গণপরিবহনের মধ্যে ১ হাজার ৫৩টির কোনো বৈধ ফিটনেস সনদ নেই। অর্থাৎ রাজধানীতে চলমান বাসের প্রায় ২৩ শতাংশই ফিটনেসবিহীন অবস্থায় যাত্রী পরিবহন করছে।
ডিটিসিএর তথ্য বলছে, তাদের অধিভুক্ত এলাকায় প্রায় ৩৭-৩৮ লাখ মানুষ বাসে যাতায়াত করে। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত বা যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া চলা বাসে করেই তাদের গন্তব্যে ছুটতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়াচ্ছে। সব মিলিয়েই রাজধানীর বাস পরিবহন ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বিদ্যমান ফিটনেস সনদ দেয়ার প্রক্রিয়া অনেকটাই কাগুজে। তাই কোনো যানবাহনের ফিটনেস সনদ থাকলেই সেটিকে প্রকৃত অর্থে নিরাপদ বলা যায় না। যথাযথ ও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা হলে বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী অনেক যানবাহনেরই ফিটনেস সনদ পাওয়ার কথা নয়।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়ম অনুযায়ী, একটি মোটরযানকে ফিটনেস সনদ দেয়ার আগে এক্সেল লোড, টায়ারের অবস্থা, গতি, ব্রেক, ধোঁয়ার নির্গমন, হেডলাইট, অ্যালাইনমেন্ট, রঙ, আসন সংখ্যাসহ মোট ৬৫ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কোনো যানবাহনের বৈধ ফিটনেস সনদ না থাকলে সেটিকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিই বাড়ায় না, বরং সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি তৈরি করে। একটি যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে ব্রেক, স্টিয়ারিং, সাসপেনশনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশেও পড়ে। ফলে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িত অনেক বাসেরই ব্রেক, স্টিয়ারিং, চাকা বা সিগন্যাল ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ থাকে। এসব যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চালক অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তাই ফিটনেস নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জননিরাপত্তার অন্যতম পূর্বশর্ত বলে মনে করছেন তারা।
রাজধানীতে ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে খাতসংশ্লিষ্টরা দায়ী করছেন রুটভিত্তিক অপরিকল্পিত পরিচালনা ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতাকে। বর্তমানে একটি রুটে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বাস চলাচল করায় যাত্রী তোলাকে কেন্দ্র করে চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এর ফলে এক বাস আরেক বাসকে ওভারটেক করা, হঠাৎ থামা, রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং অতিরিক্ত গতিতে চালানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা নিয়মিত দেখা যায়। একই সঙ্গে অনেক ছোট ও নামসর্বস্ব পরিবহন কোম্পানি তাৎক্ষণিক মুনাফার দিকে বেশি মনোযোগ দিলেও যানবাহনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি কিংবা ফিটনেস বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করে না। এর প্রভাব পড়ে বাসের সার্বিক মান ও নিরাপত্তায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতার সময় বাসগুলোর মধ্যে প্রায়ই ধাক্কাধাক্কি, ঘষাঘষি ও আকস্মিক ব্রেকের ঘটনা ঘটে। এতে বাসের বডি, চেসিস এবং অন্যান্য যান্ত্রিক অংশ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের সঙ্গে এ বেপরোয়া প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়ে অনেক বাস নির্ধারিত সময়ের আগেই চলাচলের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে।
বিআরটিএ ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের যৌথ অভিযানে এমন অনেক বাস পাওয়া গেছে, যেগুলোর কাগজে-কলমে ফিটনেসের মেয়াদ থাকলেও বাস্তবে সেগুলো নিরাপদ চলাচলের ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করে না। এ পরিস্থিতিকে সড়ক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রাজধানীর বাস ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালুর লক্ষ্যে ৩২টি প্রধান রুট ও আরো ২৫টি সার্কুলার রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব রুটে নির্ধারিত সময়সূচি ও রোটেশনাল ব্যবস্থায় বাস পরিচালনা করা হবে। তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় শুধু বাসের ফিটনেস নিশ্চিত করাই নয়, চালক ও সহকারীর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, আধুনিক টিকিটিং ব্যবস্থা, নির্ধারিত স্টপেজ এবং সমন্বিত পরিচালনা কাঠামোও নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।’


