
দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি অভ্যুত্থান আকাশচুম্বী প্রত্যাশা থাকলেও পুরনো ব্যবস্থা অপরিবর্তিত?
আগস্ট ৩, ২০২৬এআই খাতে টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াল
আগস্ট ৩, ২০২৬ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ভোর থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর আগে শনিবার দেইর আল-বালাহর আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত ওষুধের গুদামেও হামলা চালায় ইসরায়েল
গাজায় শান্তি ও নিরাপত্তার পথে একটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ বলে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির আওতায় অস্ত্র সমর্পণে রাজিও হয়েছে হামাস। এর পরও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজায় অন্তত ১৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। খবর আল জাজিরা।
গাজার আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, গতকালের নিহতদের মধ্যে গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের আল-সুসি টাওয়ারের একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে বিমান হামলায় নিহত হন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ তিনজন।
খান ইউনিস শহরের উত্তর-পশ্চিমে আল-কারারায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় আল-হামস পরিবারের তিন সদস্য নিহত হন। নাসের হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, এ হামলায় আরো তিনজন আহত হয়েছেন।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর কাছে হামলায় নিজ বাড়িতে প্রবীণ এক দম্পতি নিহত হন। একই এলাকায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় দুই ভাইও নিহত হয়েছেন।
উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে সরাসরি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় একজন ফিলিস্তিনি নিহত হন।
খান ইউনিসের আল-মাওয়াসিতে বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে হামলায় একজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হন।
গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের রেমাল এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত হন। এছাড়া গাজা সিটিতে একটি গাড়িতে হামলায় আরো চারজন নিহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ভোর থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন।
এর আগে শনিবার দেইর আল-বালাহর আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত ওষুধের গুদামেও হামলা চালায় ইসরায়েল।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেন, চিকিৎসা-সরঞ্জাম ধ্বংস করে ‘ওষুধ এবং অসুস্থতাকেই যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুটি স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং আরো দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কোনো সতর্কতা ছাড়াই হামলা
গত ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান নিচু উচ্চতায় উড়ে গাজার বিভিন্ন স্থানে একাধিক হামলা চালিয়েছে। হামলার আগে বাসিন্দাদের কোনো ধরনের সতর্কতা বা এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি।
বেশির ভাগ হামলার লক্ষ্য ছিল আবাসিক ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট এবং বেসামরিক মানুষের জটলা। ইসরায়েলের দাবি, এসব স্থানে হামাস বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন, তাই এগুলো বৈধ সামরিক লক্ষ্য।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা নুর খালেদ গতকাল বলেন, ‘যেসব এলাকায় হামলা হয়েছে, সেখানকার বাসিন্দাদের কোনো সতর্কবার্তা বা সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। গত রাতটি ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশেষভাবে ভয়াবহ ছিল। গাজা উপত্যকার প্রায় সব এলাকাতেই একের পর এক হামলা হয়েছে।’
শনিবারও গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত আটজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। শুক্রবারও পৃথক হামলায় কয়েকজন নিহত হয়েছিলেন।
এদিকে শুক্রবার ওয়াশিংটনের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার তদারকি সংস্থা বোর্ড অব পিস ও ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গাজার যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি সমঝোতার ঘোষণা দেন। বোর্ড অব পিস জানায়, হামাস একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। তবে এ প্রস্তাব নিয়ে ইসরায়েল এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
‘কাগুজে’ চুক্তি
ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, কথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং মানবিক সহায়তায় বিধিনিষেধ বজায় রেখেছে। এতে যুদ্ধবিরতি বাস্তবে ‘একটি বিভ্রমে’ পরিণত হয়েছে এবং মানবিক সংকট আরো গভীর হয়েছে।
তাদের মতে, আগের চুক্তিগুলোর মতোই এটিও শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। ২০২৪ সাল থেকে লেবাননে হওয়া একাধিক যুদ্ধবিরতি এবং গত অক্টোবরের গাজা যুদ্ধবিরতিও বাস্তবে কার্যকর হয়নি। এসব চুক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ভণ্ডুল করার অভিযোগও রয়েছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে।
কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজায় অন্তত ১ হাজার ২২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ৫৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সেখানকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
ইসরায়েলবিষয়ক গবেষক মোহানাদ মুস্তাফা বলেন, ইসরায়েল সাধারণত কোনো চুক্তিকে পুরোপুরি মেনে চলার অবস্থান থেকে এগোয় না।
তার ভাষায়, ‘এসব চুক্তি ইসরায়েলের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চাপেই ইসরায়েলকে সমঝোতা বা চুক্তির পথে যেতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘চুক্তির ভাষা ও ধারাগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয় ইসরায়েল। এরপর নিজেদের ব্যাখ্যার সঙ্গে অন্য পক্ষের ব্যাখ্যা না মেলার অজুহাতে চুক্তি লঙ্ঘনের পথ বেছে নেয়।’
মোহানাদের মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের চাপই একমাত্র বিষয়, যা ইসরায়েলের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।’
নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তি
হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাবিত রোডম্যাপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের মুখপাত্র ডরন স্পিলম্যান বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, হামাস পুরোপুরি অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত ইসরায়েল তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে না। তার দাবি, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মনে করেন হামাস স্থায়ীভাবে নিরস্ত্রীকরণের বদলে আবারোসামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এপিকে জানিয়েছেন, ইসরায়েল আরো চেয়েছে যাতে গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। এছাড়া চুক্তি বাস্তবায়ন যাচাইয়ে কাতার ও তুরস্কের অংশগ্রহণ এবং হামাসের কাছ থেকে জব্দ করা অস্ত্র নতুন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের কাছে সংরক্ষণের বদলে ধ্বংস করা হবে কিনা—এসব বিষয়েও আপত্তি তুলেছে তারা।
অন্যদিকে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেন, আলোচনার সময় হামলা বন্ধ রাখার মতো কোনো চুক্তি হয়নি। ইসরায়েলের আর্মি রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হামাস আদৌ নিরস্ত্রীকরণ করবে কিনা, সে বিষয়ে সরকার সন্দিহান। তার মতে, এ প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়া উচিত ইসরায়েলের।
হামাস অভিযোগ করেছে, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে মধ্যস্থতাকারী ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা ভেস্তে দিতেই ইসরায়েল গাজায় হামলা আরো জোরদার করেছে।
গোষ্ঠীটির দাবি, রোববার সকাল থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১৮ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অনেক পারিবারিক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। তারা যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী ও গ্যারান্টরদের প্রতি ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হামলা বন্ধ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
গাজার জন্য বোর্ড অব পিসের প্রধান দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেন, উত্তেজনা কমানো এবং রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে মধ্যস্থতাকারীরা ‘দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন’।


