আলোচনা সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী ‎জুলাইয়ের ভিত্তি রচিত হয়েছে ১৬ বছরে
আগস্ট ৩, ২০২৬
নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে হামাসের সম্মতির পরও গাজায় হামলা ইসরায়েলের, নিহত ১৯
আগস্ট ৩, ২০২৬
আলোচনা সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী ‎জুলাইয়ের ভিত্তি রচিত হয়েছে ১৬ বছরে
আগস্ট ৩, ২০২৬
নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে হামাসের সম্মতির পরও গাজায় হামলা ইসরায়েলের, নিহত ১৯
আগস্ট ৩, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি অভ্যুত্থান আকাশচুম্বী প্রত্যাশা থাকলেও পুরনো ব্যবস্থা অপরিবর্তিত?

দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বিকাল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তখন জাতীয় শহীদ মিনারে সমবেত লাখো জনতা।

ওই সমাবেশে তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে অসহযোগের ঘোষণা দেন। তাদের সেই ডাকে সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেয়। ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যান দেড় দশকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন তরুণ প্রজন্মসহ দেশের মানুষকে নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখিয়েছিল; যেখানে বৈষম্য কমবে, আইনের শাসন নিশ্চিত হবে এবং সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে বিশ্লেষক ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই মনে করছেন, তরুণরা আন্দোলনে সরকারের পরিবর্তন ঘটাতে পারলেও রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে সফল হয়নি।

শুধু বাংলাদেশ নয়, একই পরিস্থিতি নেপালের ক্ষেত্রেও। মাত্র ১০ মাস আগে সে দেশে তরুণরা আন্দোলন করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এরপর জেন-জি সমর্থিত এক র‍্যাপারকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে নতুন সরকারের নেতৃত্বে নিয়ে এসেছেন তারা। কিন্তু সম্প্রতি এ নতুন সরকারের বিরুদ্ধেই শত শত তরুণ আবারো রাস্তায় নেমে এসেছেন। কারণ রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তরুণরা যেমনটা আশা করেছিলেন, বাস্তবে তার খুব সামান্যই দেখতে পাচ্ছেন।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিকা চেনোওয়েথের মতে, জেন-জিদের এ আন্দোলনগুলো মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর, যা প্রথাগত আন্দোলনের মতো গভীর বা দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এসব আন্দোলন রাষ্ট্রে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পরিবর্তন আনতে পারছে না। ১৯৮০-এর দশকে পোল্যান্ডের ‘সলিডারিটি’ বা দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন যেভাবে দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল পর্যায়ে প্রত্যক্ষ সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছিল, বর্তমানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর ‘লিডারলেস’ বা নেতৃত্বহীন আন্দোলনগুলোয় সেই প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতার ঘাটতি স্পষ্ট।

এরিকা চেনোওয়েথের গবেষণার তথ্যমতে, রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনতে ১৯৬০-এর দশক থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী অহিংস আন্দোলনগুলোর সাফল্যের হার ৪০ শতাংশের ওপরে ছিল। বিপরীতে ২০১০ সাল থেকে অহিংস আন্দোলনগুলোর সাফল্যের হার ৩৪ শতাংশের কম এবং সহিংস আন্দোলনগুলোর মাত্র ৮ শতাংশ সফল হয়েছে।

২০১০-১১ সালের তুমুল আলোচিত আরব বসন্তের গণ-অভ্যুত্থানগুলো তরুণদের অভ্যুত্থানের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ার প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তারুণ্যনির্ভর সংগঠিত বিশাল বিক্ষোভগুলো ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবে বলে শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় কোনো দেশেই সেগুলো রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনতে পারেনি। আরব বসন্তের একমাত্র সফলতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত তিউনিসিয়া একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ (২৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এক পুলিশ সদস্যকে আবু সাইদকে লক্ষ্য করে গুলি করতে দেখা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকে ছড়িয়ে দেয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে সারা দেশের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনই রূপ নেয় সরকার পতনের বিক্ষোভে। এ আন্দোলনে মূল নেতৃত্বে যারা ছিলেন তারা প্রায় সবাই জেনারেশন জেড বা জেন-জি।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এ সরকারে হাসিনা পতন আন্দোলনের জেন-জি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছিল। সরকার গঠনের পর পরই আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি করতে গিয়ে তারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। ঐক্যবদ্ধ কোনো রাষ্ট্রীয় লক্ষ্যের পরিবর্তে নানা ব্যক্তি ও মতের পছন্দসই ছোট ছোট রূপান্তরের উদ্যোগ দেখা যায়। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি দূর করতে সেই অন্তর্বর্তী সরকার সফল হয়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। তবে এ কমিশন শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সংস্কার কাঠামো রেখে যেতে ব্যর্থ হয়।

জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের (ফ্রান্স) প্রধান ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তরুণরা সরকার পরিবর্তন করতে পারলেও আন্দোলন-পরবর্তী নতুন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়নে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এর মূল কারণ তরুণদের অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাব। তাদের সততা বা ত্যাগের কোনো ঘাটতি নেই, তবে তারুণ্যজনিত অভিজ্ঞতাহীনতার কারণেই তারা এ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।’

ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীনের মতে, আন্দোলনের পর তরুণদের প্রধান ব্যর্থতা ছিল তারা সঠিক ও অভিজ্ঞ দিকনির্দেশক নির্বাচনে ভুল করেছে এবং যোগ্য মেন্টরদের পরামর্শ গ্রহণ করেনি। তরুণদের সরলতা ও ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে এবং তরুণদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

বাংলাদেশে চব্বিশের অভ্যুত্থানে তরুণদের ওপর সরকারি নিপীড়ন শুরু হলে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষক-অভিভাবকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তানজীমউদ্দিন খানও ছিলেন সে রকম একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর অধিকাংশের ইতিহাস ঔপনিবেশিক হওয়ায় আমলাতন্ত্র অত্যন্ত জটিলভাবে তাদের আধিপত্য বজায় রাখে। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার ঘাটতি এবং পুনর্নির্মাণের চ্যালেঞ্জ থেকেই যায়, যা সর্বজনীন। তরুণদের অভ্যুত্থানের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে সুনির্দিষ্ট ও সুসংগঠিত কোনো রাজনৈতিক শক্তি থাকে না। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থা থেকে নতুন প্রজন্ম কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে সামনে আসে। ফলে সবার অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা একই রকম হলেও সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থানের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায় না।’

অনেকে মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের অভাব রাষ্ট্র ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারকে কঠিন করে তুলেছে। আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ভূঞা বলেন, ‘পৃথিবীর কমসংখ্যক বিপ্লব বা অভ্যুত্থানেই পূর্ণাঙ্গ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। পরিবর্তন না আসার যে শঙ্কা তা অভ্যুত্থানের পর সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন প্রশ্নে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার দ্বিমত থেকেই সূত্রপাত হয়। এক পক্ষ চেয়েছে আগে সংস্কার এবং সংস্কারের ভিত্তিতে নির্বাচন; আরেক পক্ষের দাবি ছিল সংস্কারের দায়িত্ব নির্বাচিত সংসদ ও সরকারের, অতএব দ্রুত নির্বাচন হতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের ব্যর্থতা দূর করতে হলে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের নতুন বন্দোবস্তের আলোকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল ও জোট গঠন একটা সমাধান হতে পারে।’

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বড় অংশ জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন করে তারা ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। জোটবদ্ধ নির্বাচন করে এনসিপি ছয়টি আসনে জয়লাভ করে।

এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ মনে করেন, মোটা দাগে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কারে সাফল্য কম দেখা গেলেও রাষ্ট্র পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, যা এ আন্দোলনের বড় সাফল্য।

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কেবল সরকার পরিবর্তন হয়নি, বরং শাসন ব্যবস্থায়ও আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ১৫ বছরের অব্যবস্থাপনার পর সব প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় কার্যকর করতে সময় লাগবে। তবে এরই মধ্যে জনগণ তাদের ভোটের অধিকার ফেরত পেয়েছে, মানবাধিকার রক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দেশ যুক্ত হয়েছে।’

তবে আলাউদ্দীন মোহাম্মদ রাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনে সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। তার কথায়, ‘এটিও সত্যি যে কাঙ্ক্ষিত জাতীয় ঐক্য কেবল সীমিত কিছু ক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার কারণে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আমি মনে করি, বৃহৎ ক্ষেত্রে এ সাফল্য অর্জিত না হওয়ার মূল কারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক দলগুলোর আকাঙ্ক্ষার কাছে অনেক জায়গায় উপেক্ষিত হয়েছে। তবু রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন অস্বীকার করার সুযোগ নেই এবং বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা ধরে রাখারও কোনো বিকল্প নেই।’

জুলাই অভ্যুত্থানে বিভিন্নভাবে ভূমিকা ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের। গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য কেবল একটি সরকারের পরিবর্তন ছিল না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) জিএস ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এসএম ফরহাদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল আর ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে না। প্রত্যাশিত পরিবর্তন পুরোপুরি না এলেও অন্তত একটি ন্যূনতম সংস্কার কাঠামো সামনে এসেছিল। জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ করার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ জনগণের সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে জনগণের সমর্থনপ্রাপ্ত সেই মৌলিক সুপারিশগুলোও কার্যকর করেনি। সংবিধানের মূল নীতিমতে, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ। অথচ গণভোটে সমর্থিত বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়েছে এবং বারবার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।’

এসএম ফরহাদ আরো বলেন, ‘বিচার বিভাগ, পিএসসি, দুদক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, ব্যাংক খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর পরিবর্তে পুরনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কারণেই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা—রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে কর্তৃত্ববাদমুক্ত করা—এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।’

অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচনের পর দেশ এখন সুশাসন ও জবাবদিহির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন,

‘‌জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল কারণ ছিল দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে মানুষের ভোটাধিকার হরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও বঞ্চনা। এই ক্ষোভ থেকেই তরুণরা রাস্তায় নেমেছিল এবং নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। ২০২৬ সালে এসে দেশে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের পছন্দের সরকার ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ বলতে পারেন, জুলাই সনদের সব লক্ষ্য এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বা সংস্কার শতভাগ সম্পন্ন হয়নি; কিন্তু আমরা আশাবাদী যে, সেগুলোও হয়ে যাবে।’

রাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘‌আমলাতন্ত্রের অতিমাত্রায় প্রভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। বিগত ১৭ বছরে প্রকৃত অর্থে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতির কারণে আমলাতন্ত্রের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে বর্তমানে একটি শক্তিশালী ও নির্বাচিত সংসদ এবং কার্যকর বিরোধী দল থাকায় ধীরে ধীরে সেই প্রভাব কমে আসবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া তরুণদের যে স্বপ্ন, আশা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল, দেশ এখন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।’

দক্ষিণ এশিয়ার জেন-জি আন্দোলনের মতো একই ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল আরব বসন্তে। সেখানেও আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তরুণরা। এ আরব বসন্তের সূতিকাগার ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি দীর্ঘ ২৩ বছর গদি দখল করে রাখা বেন আলি ক্ষমতাচ্যুত হন।

কিন্তু তিউনিসিয়ায় অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে শুরুতেই বিতর্কিত করে তোলে আগের প্রশাসনের সুবিধাভোগীদের উপস্থিতি। অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও তেমন কোনো অর্জন দেখাতে পারেনি সেই সরকার। তৈরি করা যায়নি তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সেকুলার ও ডানপন্থীদের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে দেখা দেয় এক দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি জনসম্পৃক্ততা তৈরি করা যায় তবে তরুণদের আন্দোলনেরও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনের সুযোগ রয়েছে। ব্যাংককের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জানজিরা সোম্বাতপুনসিরি মনে করেন, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে যদি নাগরিক সমাজ, মূলধারার রাজনৈতিক দল ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির সঙ্গে একটি “ব্যাপকভিত্তিক জোট” তৈরি করা যায়, তবেই রাষ্ট্রে গভীর সংস্কার সম্ভব।

এ রকম সাফল্য এসেছে থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকায়। থাইল্যান্ডের দেড় দশক আগে বিভিন্ন সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী তরুণ নেতৃত্ব বিভিন্ন ধাপে ‘পিপলস পার্টি’ নামে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গঠন করে। দলটি ২০২৩ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছিল। ব্যাংককের মেট্রোপলিটান এলাকাতেও তাদের বেশ প্রভাব গড়ে উঠেছে।

একইভাবে শ্রীলংকায় ২০২২ সালের তীব্র আন্দোলনে সরকার উৎখাত হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটাররা বামপন্থী দল ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ারের (এনপিপি) অনুরা কুমারা দিসানায়েককে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেন। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ সরকার রাষ্ট্রে বিভিন্ন সংস্কার আনতে কাজ করছে।

জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল চব্বিশের অভ্যুত্থানে মূল এজেন্ডা সংস্কার ছিল ছিল না। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারীরা মানুষকে সংগঠিত করার সুযোগ পায়নি। মানুষ একটা অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে, তার অত্যাচারের অবসানের উদ্দেশ্যে আন্দোলনে শরিক হয় এবং অভ্যুত্থান ঘটে। কিন্তু এরপর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশেষ এজেন্ডার প্রয়োজন ছিল, এর জন্য মানুষকে সচেতন করা, সংগঠিত করার দরকার ছিল। কিন্তু সেসব কিছুই জুলাই অভ্যুত্থানের পরে ছিল না। ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনও আসেনি। এ পরিবর্তনটা আনতে হলে প্রকৃতপক্ষে দেশের সর্বস্তরে সংগঠন থাকা প্রয়োজন, যেখান থেকে দাবি উঠবে এবং পরিবর্তন হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *