
বায়ুদূষণ ও তামাক নীরব ঘাতক দেশে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্তের প্রায় সমান হারে মৃত্যু
আগস্ট ১, ২০২৬
সংস্কার নেই দীর্ঘদিন, দুর্ভোগে সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের যাত্রীরা
আগস্ট ১, ২০২৬চাঁপাইনবাবগঞ্জকে দেশের আমের রাজধানী বলা হয়। প্রতি বছর হাজার হাজার টন আম উৎপাদন হয় এখানে।
তবে মৌসুম শেষে কৃষকরা প্রায়ই দাম নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। অতিরিক্ত উৎপাদন আর সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয় বিপুল পরিমাণ আম। কৃষকের এ হতাশা আর অনিশ্চয়তা দূর করতে ভিন্ন এক উদ্যোগ নিয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলার ইসমাইল হোসেন শামীম। থাইল্যান্ডের মডেলে দেশেই তৈরি করছেন ‘ড্রাইড ম্যাংগো’। তার এ উদ্যোগ শুধু আম নষ্ট হওয়া ঠেকাবে না, বরং খুলবে রফতানির নতুন দুয়ার।
দীর্ঘ গবেষণা, বিদেশ সফর আর অসংখ্য ব্যর্থতা পেরিয়ে শামীম গড়ে তুলেছেন ‘নওয়াবি ম্যাংগো’। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ড্রাইড ম্যাংগো, ম্যাংগো বার ও ম্যাংগো লেদার বানাচ্ছে। লক্ষ্য শুধু দেশের বাজার নয়, আন্তর্জাতিক বাজারও।
শামীম দীর্ঘদিন স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন মূল্য সংযোজন ও প্রক্রিয়াকরণ। শামীম বলেন, ‘আমরা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিপুল পরিমাণ আম পাই। কিন্তু মৌসুম শেষ হলে কৃষকের হাতে কিছু থাকে না। আম প্রক্রিয়াজাত করা গেলে সারা বছর বাজার তৈরি সম্ভব।’
২০১৯ সালে শামীম থাইল্যান্ডে যান। সেখানকার সুপারশপে আমজাত পণ্য দেখে আগ্রহী হন। তবে তখনো ব্যবসার কথা ভাবেননি। ২০২২ সালে আবারো থাইল্যান্ডে যান তিনি। সেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ড্রাইড ম্যাংগো তৈরি ও রফতানি করা দেখেন। তখনই দেশে ফিরে এ নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে ম্যাংগো বার ও লেদার তৈরির পরিকল্পনা করেন। স্থানীয়ভাবে কিছু যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মান পাচ্ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘গ্রামের অনেক নারীও ম্যাংগো বার তৈরি করেন। কিন্তু আমি চেয়েছি শিল্পমানের, স্বাস্থ্যসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণযোগ্য একটি পণ্য তৈরি করতে।’
এরপর তিনি ড্রাইড ম্যাংগো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল আমের রঙ ও টেক্সচার ধরে রাখা। প্রথমদিকে স্বাদ ভালো হলেও রঙ ঠিক থাকছিল না। শামীম বলেন, ‘প্রথমবার যখন পণ্য তৈরি করলাম, তখন মনে হয়েছিল হয়তো হবে না। কিন্তু খেতে ও টেক্সচার ভালো ছিল। তখনই আত্মবিশ্বাস পাই যে আরো গবেষণা করলে সফল হওয়া সম্ভব।’
সাতক্ষীরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বিভিন্ন জাতের আম সংগ্রহ করেন তিনি। গবেষক ও খাদ্য প্রযুক্তিবিদদের পরামর্শ নেন। কীভাবে রঙ ও মান ধরে রাখা যায়, তা নিয়ে কাজ করেন। ২০২৫ সালের আম মৌসুমজুড়ে শুধু গবেষণা ও পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলে। তিনি বলেন, ‘গত বছরের আগস্টে গিয়ে আমি নিশ্চিত হতে পারি যে আমরা কাঙ্ক্ষিত মানের ড্রাইড ম্যাংগো তৈরি করতে পেরেছি।’
সফল পরীক্ষার পর ‘নওয়াবি ম্যাংগো’র বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। দুটি মেশিনে চলছে কাজ। কাজ করেন চারজন কর্মী। মাসে ৭০০ কেজি ম্যাংগো বার তৈরি হচ্ছে। দিনে ৩৫ কেজি ড্রাইড ম্যাংগো তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে এটি ৩০০-৪০০ কেজিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। এরই মধ্যে জাপান ও যুক্তরাজ্যে পণ্যের নমুনা পাঠানো হয়েছে। বিদেশীরা ইতিবাচক মত দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে সীমিত আকারে রফতানির আলোচনা চলছে। শামীম বলেন, ‘উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে রফতানিতে যেতে চাই। তবে দেশের বাজারও আমাদের জন্য বড় সুযোগ।’
দেশে বর্তমানে থাইল্যান্ডের ড্রাইড ম্যাংগোর আধিপত্য। শামীমের মতে, সেগুলোতে উচ্চমাত্রার চিনি থাকে। অবৈধভাবে আসা কিছু পণ্যের কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ভোক্তারা শুধু দাম দেখেন। কিন্তু স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরিতে খরচ বেশি হয়। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা থাকলে দেশীয় উদ্যোক্তারাই বাজার দখল করতে পারবেন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। রফতানি খাতেও সম্ভাবনা তৈরি হবে। শামীমের ভাষায়, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুধু কাঁচা আমের জেলা হয়ে থাকুক, সেটা চাই না। আমি চাই এখান থেকে বিশ্বমানের আমজাত পণ্য তৈরি হোক। একদিন বিদেশ থেকে ড্রাইড ম্যাংগো আমদানি না করে বাংলাদেশের ড্রাইড ম্যাংগোই রফতানি হবে।’
এ বিষয়ে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, ‘দেশে আমের উৎপাদন ব্যাপক বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেই কৃষক লাভবান হন না। অনেক সময় অতিরিক্ত উৎপাদনে দাম কমে যায়। এটি কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়। এ থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় ভ্যালু অ্যাডেড শিল্পের বিকাশ। যখন জুস, পাল্প, আমচুর ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনকারীরা বাজারে আসবেন, তখন আমের চাহিদা সারা বছর থাকবে। এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন আমচাষীরাই।’


