গ্রেফতার
আগস্ট ১, ২০২৬
জাপান থেকে যুক্তরাজ্য নওয়াবি ম্যাংগোতে দেশের শুকনো আমের নতুন সম্ভাবনা
আগস্ট ১, ২০২৬
গ্রেফতার
আগস্ট ১, ২০২৬
জাপান থেকে যুক্তরাজ্য নওয়াবি ম্যাংগোতে দেশের শুকনো আমের নতুন সম্ভাবনা
আগস্ট ১, ২০২৬

বায়ুদূষণ ও তামাক নীরব ঘাতক দেশে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্তের প্রায় সমান হারে মৃত্যু

বছরে নতুন করে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় ১৩ হাজার বাংলাদেশী। মারা যাচ্ছেন ১২ হাজারের মতো। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এ ব্যবধানহীন চিত্রই বলে দিচ্ছে রোগটির ভয়াবহতা।

শুধু ধূমপান নয়; বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান, শিল্প-কারখানার দূষণ, রান্নাঘরের ধোঁয়া ও কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শও ক্রমে বাড়াচ্ছে ঝুঁকি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দেশের পুরুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া এবং চিকিৎসার সীমিত সুযোগ ফুসফুস ক্যান্সারে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ।

আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার (আইএআরসি) গ্লোবোক্যানের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২২ সালে নতুন করে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ওই বছর মৃত্যু হয় প্রায় ১২ হাজার আক্রান্তের। এর মাত্র দুই বছর আগে ২০২০ সালে দেশে ফুসফুস ক্যান্সারে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৭০৪। মৃত্যু হয় ১১ হাজার ৭৪৬ জনের। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়লেও মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় একই রয়ে গেছে। এ চিত্র বাংলাদেশের ফুসফুস ক্যান্সার পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে—রোগটি শনাক্ত হওয়ার পর বেঁচে থাকার সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত।

বাংলাদেশে ক্যান্সারের ধরন ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। গ্লোবোক্যানের তথ্য অনুযায়ী, ক্যান্সারের মধ্যে পুরুষ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় খাদ্যনালির ক্যান্সারে। এরপরই ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার তৃতীয় অবস্থানে। তবে মৃত্যুর হারে ঘাতকের ভূমিকায় ফুসফুস ক্যান্সার দ্বিতীয়। শুধু ২০২২ সালেই পুরুষদের মধ্যে নতুন ফুসফুস ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৩৩। অর্থাৎ দেশে নতুন শনাক্ত ফুসফুস ক্যান্সার রোগীর বড় অংশই পুরুষ।

ফুসফুস ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ তামাক ব্যবহার। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের ধূমপানের সঙ্গে এ রোগের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তবে দেশে ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি এখন আর শুধু ধূমপানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বায়ুদূষণও। শহরাঞ্চলে যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, শিল্প-কারখানার নির্গমনসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ও সূক্ষ্ম কণা দীর্ঘদিন শ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে ধূমপায়ীর আশপাশে থাকা ব্যক্তিরাও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষণের সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

গ্রামাঞ্চলেও ঝুঁকির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণ। রান্নার কাজে ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে তৈরি ধোঁয়া পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে ঘরের ভেতর দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে। এ ধরনের দূষিত বাতাসে নিয়মিত শ্বাস নেয়ার ফলে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, শিল্প-কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও রয়েছে বাড়তি ঝুঁকি। কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধুলা, ধোঁয়া, রাসায়নিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসে তার দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

শ্যামলী টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফুসফুস ক্যান্সার বৃদ্ধির পেছনে ধূমপানের পাশাপাশি বর্তমানে বায়ুদূষণ, পরিবেশে বিষাক্ত ধূলিকণা, শিল্প-কারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া, জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব কারণে মানুষের ফুসফুস প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ছে। তবে আরেকটি বড় সমস্যা হলো অধিকাংশ রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন না। অনেকেই উপসর্গকে গুরুত্ব দেন না বা অবহেলা করেন। আবার কেউ কেউ চিকিৎসা শুরু করলেও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তা সম্পন্ন করেন না। ফলে রোগটি ধরা পড়ে অনেক দেরিতে, যখন ক্যান্সার এরই মধ্যে অগ্রসর পর্যায়ে চলে যায়। এ অবস্থায় চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে এবং রোগীকে সুস্থ করে তোলার সম্ভাবনাও কমে যায়।’

দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, কফের সঙ্গে রক্ত, অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া কিংবা দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও অনেক রোগী শুরুতে এগুলোকে সাধারণ শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা বলে মনে করেন। ফলে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি হয় এবং রোগ শনাক্ত হয় অনেকটা অগ্রসর পর্যায়ে। তাই রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর ১ আগস্ট বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার দিবস পালিত হয়। ২০১২ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ শনাক্ত হওয়ার পরও চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। উন্নত রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি, বিশেষায়িত চিকিৎসক, ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সীমিত প্রাপ্যতার পাশাপাশি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় অনেক রোগীর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেকেই এমন সময়ে চিকিৎসার আওতায় আসেন, যখন ক্যান্সার এরই মধ্যে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায় এবং মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

গ্লোবোক্যানের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭৫ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই কোনো ব্যক্তির ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আজীবন ঝুঁকি ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ১১ জনই ৭৫ বছর বয়সের আগেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সময়ে ক্যান্সারে মৃত্যুর সম্ভাবনা ৮ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় আটজনের ৭৫ বছর বয়সের আগেই ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে।

দেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে আগামী দিনে ক্যান্সারের সামগ্রিক বোঝা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণে জোর দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ডা. রুবাইউল মোরশেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অধিকাংশ মানুষই নিজেদের রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকেন না। ফলে রোগটি শেষ মুহূর্তে গিয়ে শনাক্ত হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোর সব জায়গায় ক্যান্সারের চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষেও ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক মানুষই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকারের আরো গুরুত্ব দিয়ে নজর দেয়া উচিত।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *