
ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা করল বিএসটিআই
জুলাই ২২, ২০২৬
আন্দোলনে উত্তাল নয়াদিল্লি যন্তর মন্তরে ককরোচ, মোদির বাসভবনের সামনে থেকে রাহুল-প্রিয়াংকা আটক
জুলাই ২২, ২০২৬নাদের আহমেদ রিমনের স্বপ্ন ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চ শিক্ষা নেয়া। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটারও পেয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রায় ৬ লাখ টাকা টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও ডরমিটরি চার্জ পরিশোধ করেন।
এরপর অপেক্ষা ছিল শুধু ভিসার। কিন্তু সে অপেক্ষা আজ পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তা, ঋণের বোঝা আর হতাশায়। ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় নথিই জমা দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। উল্টো পাঁচ মাস পার হলেও ফেরত মেলেনি জমা দেয়া অর্থ।
রিমনের মতো একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন প্রায় ৩০০ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। দক্ষিণ কোরিয়ার শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়ে তারা এখন একদিকে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছেন, অন্যদিকে আটকে গেছে তাদের প্রায় ১৮ কোটি টাকা।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়টি টিউশন ফি নিলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ভিসা প্রক্রিয়া শুরুই করেনি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রিফান্ড নীতিমালা অনুযায়ী, ভিসা না হলে বা ভর্তি সম্পন্ন না হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাস্তবে সে নীতির কোনো প্রয়োগ হয়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগীদের এড়িয়ে চলছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, দক্ষিণ কোরিয়ায় ভর্তি প্রক্রিয়ার নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে, এরপর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দেয়। কিন্তু শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিলেও অধিকাংশের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশনে নথিই জমা দেয়নি। ফলে ভিসার জন্য আবেদনই করতে পারেননি তারা।
পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর স্থানীয় প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীরা বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো কার্যকর উত্তর মেলেনি। লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েও মেলেনি সাড়া।
এরই মধ্যে সামনে এসেছে আরো উদ্বেগজনক তথ্য। গত ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স এক নোটিসে জানায়, দক্ষিণ কোরিয়ার আদালত গত ৩ জুলাই শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাকারী ‘ওয়ানসক এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন’কে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড. জুন সু কিম এক অফিশিয়াল বার্তায় নিশ্চিত করেছেন, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আদালত নিয়োজিত ট্রাস্টির তত্ত্বাবধানে আইনি পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। তবে প্রতিষ্ঠান বন্ধ না হওয়ার দাবি করা হলেও শিক্ষার্থীদের আটকে থাকা অর্থ কীভাবে ফেরত দেয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ফি জমা দেয়া প্রায় ৩০০ বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর তালিকা এসেছে বণিক বার্তার হাতে। প্রত্যেককে টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও আবাসন ব্যয় মিলিয়ে ৭১ লাখ ৩০ হাজার কোরিয়ান ওন, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬ লাখ টাকা করে জমা দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে জমা হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। আর এ অর্থের বড় অংশই এসেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয় থেকে। কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে সন্তানের বিদেশে পড়ার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেছেন। সে স্বপ্নই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের কাছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির গ্লোবাল বিজনেস ম্যানেজমেন্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সে ভর্তির আবেদনকারী নাদের আহমেদ রিমনের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের স্প্রিং সেশনের জন্য তিনি গত ৭ জানুয়ারি অফার লেটার পান। ১৪ জানুয়ারির মধ্যে ফিসহ যাবতীয় অর্থ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। সে অনুযায়ী ১৩ জানুয়ারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে নির্ধারিত অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে পাঠান রিমন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার কাগজপত্র না পাঠানোর কারণে ভিসা পাননি।
এ বিষয়ে নাদের আহমেদ রিমন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা কোনো উত্তর দিচ্ছে না। আমাদের কারো জন্য ইমিগ্রেশনে আবেদনই করা হয়নি, তাই কেউ ভিসাও পাইনি। গত পাঁচ মাস ধরে শুধু বলা হচ্ছে আগামী সপ্তাহে টাকা ফেরত দেয়া হবে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় আমরা আদৌ টাকা ফেরত পাব কিনা, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরেক শিক্ষার্থী ফয়সাল পাটওয়ারী। গত মার্চে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইমিগ্রেশনে কোনো কাগজপত্রই দেয়নি, যে কারণে ভিসা পাননি। এ বিষয়ে ফয়সাল পাটওয়ারী বলেন, ‘রিটার্ন পলিসি অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে টাকা ফেরত দেয়ার কথা কিন্তু পাঁচ মাসেও টাকা ফেরত পাচ্ছি না। কোনো ই-মেইলের রিপ্লাইও দিচ্ছে না। আমাদের এক কোরিয়ান ছোট ভাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলাম। তাকে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপ্রেজেন্টেটিভদের সঙ্গে কথা বলতে।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অর্থ ফেরত না পাওয়ায় অনেক পরিবার এখন ঋণের চাপে দিশেহারা। অনেকে আবার নতুন করে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সামর্থ্যও হারিয়েছেন। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের দাবি তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তারা ঢাকায় নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা নিয়ম মেনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে টাকা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গাফিলতির কারণে আমাদের কোটি কোটি টাকা আটকে গেছে। কোরিয়ান সরকারের কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় দ্রুত অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হোক।’”
উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয়তা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তুলনামূলক কম খরচ, বৃত্তির সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর শত শত শিক্ষার্থী দেশটিতে পাড়ি জমান। তবে শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনা বিদেশে ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের অর্থ সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশের অফিশিয়াল প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়া উই কেয়ার এডুকেশন জানিয়েছে, তারা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১২০ শিক্ষার্থীর আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির স্টুডেন্ট কাউন্সেলর আসানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা কোরিয়ার প্রায় ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি কাজ করি। এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে (শিনগিয়ংজু) শতাধিক ফাইল জমা দিয়ে অফার লেটার এসেছে। অল্প কিছু শিক্ষার্থীকে ভিসা দিয়েছে কিন্তু অধিকাংশের ফাইল ভিসার জন্য বিশ্বিবদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জমা দেয়নি।’
অর্থ রিফান্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাধারণত ভিসা না হলে ৯০ দিনের মধ্যে যে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠানো হয়, সেখানেই রিফান্ড করার নিয়ম। কিন্তু এক মাস ধরে আমাদের কোরিয়ান প্রতিনিধিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না। পরে জানতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাকারী ফাউন্ডেশনকে আদালত দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন।’


