থানা থেকে পালিয়ে গেল সাজাপ্রাপ্ত আসামি
জুলাই ২০, ২০২৬
যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবল ট্র্যাকিংয়ের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ পর্যায়ে
জুলাই ২১, ২০২৬
থানা থেকে পালিয়ে গেল সাজাপ্রাপ্ত আসামি
জুলাই ২০, ২০২৬
যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবল ট্র্যাকিংয়ের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ পর্যায়ে
জুলাই ২১, ২০২৬

নতুন খাত ও দেশের বাইরের গন্তব্যে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে গড়া পুঁজি ও সম্পদ

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের রফতানি খাতে পরিণত করা উদ্যোক্তারা কারখানার উৎপাদন ও সম্প্রসারণেই মনোযোগী ছিলেন।

তারা লভ্যাংশ পুনরায় বিনিয়োগ করেছেন উৎপাদন বাড়াতে, কারখানার সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। প্রতি ইউনিটে সেন্টের ভগ্নাংশ মেপে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু এখন সেই যুগের অবসান ঘটছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি পোশাক শিল্পে গড়ে ওঠা পুঁজি ও সম্পদ এখন ক্রমেই দুবাই, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনের আবাসন, আর্থিক সেবা, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের শিল্পোদ্যোক্তারা নীরবে এমন বহুমুখী বিনিয়োগ পোর্টফোলিও গড়ে তুলছেন, যার ধরন গাজীপুরের কারখানাকেন্দ্রিক ব্যবসার চেয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।

গড়ে ওঠা শিল্পের ব্যাপ্তি

বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৪ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ শিল্পে কর্মরত ৪০ লাখের বেশি শ্রমিকের অধিকাংশই নারী। আনাম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ ও বেক্সিমকোর মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর উদ্যোক্তা পরিবারগুলো কঠোর ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার এবং কয়েক দশকের ধারাবাহিক পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছে।

বেক্সিমকোর সালমান এফ রহমান বস্ত্র, ওষুধ, গণমাধ্যম ও আবাসন খাত মিলিয়ে একটি কনগ্লোমারেট গড়ে তুলেছেন। তার ব্যবসায়িক যাত্রা দেখায়, শিল্পটির উচ্চাভিলাষী উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিষয় বুঝেছেন—উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপকে একই ছাতার নিচে আনা এবং ব্যবসাকে একাধিক খাতে ছড়িয়ে দেয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল। তবে ২০২৫-২৬ সালে এসে বদলে গেছে এ বহুমুখীকরণের গতি ও ভৌগোলিক পরিধি।

আবাসন খাত ও উপসাগরমুখী মোড়

সবচেয়ে দৃশ্যমান পুঁজি স্থানান্তর ঘটছে আবাসন খাতে, বিশেষ করে জিসিসি-ভুক্ত দেশগুলোয়। নিজেদের সম্পদের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে চাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর কাছে দুবাই এখনো দেশের বাইরের সবচেয়ে পছন্দের কেন্দ্র। বাংলাদেশের পুঁজিও এর ব্যতিক্রম নয়।

বড় কয়েকটি বস্ত্র শিল্পগোষ্ঠীর দ্বিতীয় প্রজন্মের উত্তরসূরিরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে হোল্ডিং কোম্পানি গড়ে তুলেছেন। মূলধনি মুনাফায় কর না থাকা, সুসংগঠিত মুক্তাঞ্চল ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিনিয়োগ সুযোগের কাছাকাছি অবস্থান তাদের সেখানে আকৃষ্ট করছে।

এক্ষেত্রে সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফোর্বস মিডলইস্টের ২০২৬ সালের সবচেয়ে ধনী আরবদের তালিকায় ৩৭ জন বিলিয়নেয়ার রয়েছেন, যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ১৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা ৮ শতাংশ বেড়েছে। এ উত্থান বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

এএইচএস প্রপার্টিজের মাধ্যমে মাত্র ২৬ বছর বয়সে আব্বাস সাজওয়ানির বিলিয়নেয়ার হয়ে ওঠা উপসাগরীয় অঞ্চলের আবাসন বাজার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়—এ বাজার আগেভাগে বিনিয়োগ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি, বহু প্রজন্মের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করে। বাজারটির ওপর নজর রাখা বাংলাদেশের পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই শিক্ষাই নিচ্ছে।

কৌশলগত সম্পদ খাত হিসেবে কৃষি ব্যবসা

আবাসনের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ব্যবসাও বাংলাদেশের শিল্পগোষ্ঠীগুলোর নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য হয়ে উঠছে। এর কারণ স্পষ্ট—এসব পরিবার সরবরাহ শৃঙ্খল পরিচালনা এবং বড় পরিসরে পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় আগে থেকেই দক্ষ।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের উইলমার ইন্টারন্যাশনাল ও নাইজেরিয়ার ট্রপিক্যাল জেনারেল ইনভেস্টমেন্টস গ্রুপ সমান অংশীদারত্বে একটি যৌথ উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বাজারকে লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা এ উদ্যোগ এশিয়ার বিভিন্ন পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের নজর কেড়েছে। তাদের ধারণা, একাধিক মহাদেশে বিস্তৃত এ কৃষিভিত্তিক ব্যবসার মডেল নিজেদের কাছাকাছি বাজারেও অনুসরণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য একই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, অ্যাকুয়াকালচার বা মৎস্য চাষ ও হিমায়িত সামুদ্রিক খাদ্য রফতানিতে। পোশাক শিল্পে গড়ে ওঠা কয়েকটি পারিবারিক শিল্পগোষ্ঠী এরই মধ্যে এসব খাতে বিনিয়োগ শুরু করেছে।

এক্ষেত্রে যুক্তিটা পরিষ্কার। যে বিতরণ নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং সম্পর্ক ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভিজ্ঞতা তৈরি পোশাক খাতকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে, একই সক্ষমতা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণেও কাজে লাগানো সম্ভব। কম শ্রম ব্যয় ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশকে এ খাতে সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সুবিধা দিয়েছে।

প্রযুক্তি, ফিনটেক ও নতুন প্রজন্ম

বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পভিত্তিক ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর তরুণ সদস্যরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে প্রযুক্তি উদ্যোগে পুঁজি বিনিয়োগ করছেন। তাদের বিনিয়োগের ধরন দেখে বোঝা যায়, এটি কেবল চলতি প্রবণতার পেছনে ছোটা নয়; বরং বাজারের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রকৃত আস্থা থেকেই তারা এগোচ্ছেন। বাংলাদেশের আর্থিক প্রযুক্তি বা ফিনটেক খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের মাধ্যমে প্রতি মাসে শত শত কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়। এটি উদীয়মান বিশ্বে মোবাইল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণে একটি দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে।

পোশাক শিল্পে গড়ে ওঠা কয়েকটি পারিবারিক বিনিয়োগপ্রতিষ্ঠান দেশের পাশাপাশি ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনীয় বাজারে ফিনটেক প্লাটফর্ম, লজিস্টিকস প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও ই-কমার্স সহায়ক কোম্পানিতে সংখ্যালঘু শেয়ার নিয়েছে।

আফ্রিকার আলিকো ডাঙ্গোটের ব্যবসায়িক উত্থান যারা অনুসরণ করেছেন, তাদের কাছে এ কৌশল নতুন নয়। ২০২৬ সালে ডাঙ্গোটে সিমেন্টের শেয়ারদর ৬৯ শতাংশ বাড়ে এবং কোম্পানিটি রেকর্ড ১ ট্রিলিয়ন নাইরা মুনাফা করে। এর ফলে ডাঙ্গোটের নিট সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৫০ কোটি ডলারে।

এরপর তিনি আরেক ধাপ এগিয়ে যান। শোধনাগারের সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে একটি চীনা যন্ত্রপাতি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৪০ কোটি ডলারের চুক্তি করেন। একটি খাতে প্রভাবশালী বাজার অবস্থান অন্য খাতে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পভিত্তিক পরিবারগুলোও ঠিক এ কৌশলই অনুসরণ করছে।

পারিবারিক বিনিয়োগপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবস্থাপনা

বহুমুখীকরণের এবারের ধাপকে আগের প্রবণতাগুলো থেকে আলাদা করেছে এর প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতা। একসময় দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একক পরিবারের সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ‘সিঙ্গেল ফ্যামিলি অফিস’ ছিল বিরল। এখন এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে সুস্পষ্ট বিনিয়োগ নীতিমালা, স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ও পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপক নিয়ে।

দুবাই, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অভিজ্ঞ সম্পদ ব্যবস্থাপক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। অঞ্চলের বাইরের খুব কম মানুষই এখনো এ পরিবর্তন লক্ষ করেছে, যদিও বিষয়টি তাদের নজরে পড়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকাভিত্তিক কয়েকটি বিশিষ্ট পরিবার উপসাগরীয় অঞ্চলের পারিবারিক বিনিয়োগপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার মডেলে অভিজ্ঞ উপদেষ্টা নিয়োগ করেছে। ওই মডেলে গোপনীয়তা, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং বহু প্রজন্মব্যাপী শাসন ব্যবস্থাকে প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার মূল শৃঙ্খলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দাতব্য তহবিলও এখন আরো পরিকল্পিত কাঠামোর মধ্যে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি মোকাবেলায় যেসব ফাউন্ডেশন গড়ে উঠছে, সেগুলোর লক্ষ্য শুধু সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি নয়; একই সঙ্গে এমন একটি সুশাসন ও সুনামভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি তৈরি করা, যা জিসিসি, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকায় বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ বাড়ায়।

কারণ শুধু বিপুল সম্পদ থাকলেই এসব পরিসরে প্রবেশাধিকার মেলে না; প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়।

এরপর কী?

এটি শিল্প খাত থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা নয়। কারখানাগুলো এখনো এসব পরিবারের ব্যবসার কেন্দ্রেই রয়েছে। তবে কোথায় এবং কীভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত তারা আবেগের বশে নেয় না, বরং যা ঘটছে, তা হলো সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি পরিকল্পিত পরিণতি। সম্পদ কীভাবে সংগঠিত হবে, কোথায় বিনিয়োগ করা হবে এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরের সময় কীভাবে তার স্থায়িত্ব বজায় রাখা হবে, সেটিই এখন মূল বিবেচনা।

আগামী দশকে এগিয়ে থাকবে সেই পরিবারগুলো, যারা ২০২৫-২৮ সময়কে কাজে লাগিয়ে কার্যকর আন্তঃসীমান্ত বিনিয়োগ প্লাটফর্ম গড়ে তুলবে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থায়ী উপস্থিতি তৈরি করবে এবং বহু প্রজন্ম ধরে বহুমুখী বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সুশাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে।

এ বাজারের দিকে নজর রাখা ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, ফ্যামিলি অফিস ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—বাংলাদেশের শিল্প পুঁজি এখন বৈশ্বিক ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করছে।

আবাসনে যৌথ বিনিয়োগ, কৃষিভিত্তিক ব্যবসায় অংশীদারত্ব ও প্রযুক্তি উদ্যোগে প্রবেশের জন্য এখনই সবচেয়ে অনুকূল সময়। কারণ এসব খাতে বিনিয়োগের মূল্য ও প্রতিযোগিতা আরো বেড়ে গেলে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *