
তরুণদের ভবিষ্যৎমুখী কর্মদক্ষ করে গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
জুলাই ১৪, ২০২৬
সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলে ২০২৬ সালে নির্বাচনও নেই: শফিকুর রহমান
জুলাই ১৪, ২০২৬এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিপাত ও বন্যায় নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা। এ সংকটের মধ্যে প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এর ফলে মোবাইল নেটওয়ার্কও বিঘ্নিত হচ্ছে। গতকাল থেকে বৃষ্টির পরিমাণ কমে এলেও এখনো অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ না আসায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে পারছে না মানুষ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল, রাঙ্গামাটির অধীনে থাকা তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। সর্বোচ্চ লোড ১০০ মেগাওয়াট হলেও প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিতরণ হয় তিন জেলায়। ৭ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস ও বন্যার কারণে পার্বত্যাঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে, বৈদ্যুতিক তারের ওপর গাছ পড়ে তা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও আবার বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর পাহাড় ধসে এ সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও মিলছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, অনেক স্থানে মানুষের নিরাপত্তার প্রয়োজনে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। আবার বান্দরবানের রুমাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি সড়ক ধসে পড়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও বিদ্যুৎকর্মীরা তাৎক্ষণিক সংযোগ মেরামত করতে পারেননি। এ কারণে এখনো রুমা উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুরোপুরি দিতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ।
এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও চট্টগ্রাম পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১-এর অধীনে আটটি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার গ্রাহক সংখ্যা সাত লাখ। মূলত ৭ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টিপাত ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রায় দুই লাখের অধিক গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর সংযোগ পুনরুদ্ধার কাজ শুরু হলেও এখনো বিভিন্ন উপজেলায় অনেক গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে শুধু সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার গ্রাহকের।
তবে বাস্তবে বিদ্যুৎহীন গ্রাহকের সংখ্যা অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে বোয়ালখালী, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অনেক ইউনিয়নে পানি থাকায় সেখানে বৈদ্যুতিক পোল ভেঙে, মিটার সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একইভাবে পরিমাণে কম হলেও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২-এর অধীনে থাকা ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার কারণে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিলেন হাজার হাজার গ্রাহক। এখনো হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি উপজেলার অনেক গ্রাহক বিদ্যুৎ ছাড়া দিনাতিপাত করছেন। সঙ্গে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় ভোগান্তি আরো বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির অধীনে দক্ষিণাঞ্চলের আট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী। বান্দরবানের পাহাড় ও সাঙ্গু নদীর পানি উজান থেকে দ্রুত বেগে প্রবাহিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে এ দুই উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমরা সীমিত জনবল দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সংযোগ চালু করতে কাজ করেছি। এখনো যেসব এলাকায় বন্যার পানি রয়েছে সেখানে সংযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি। পানি নেমে গেলেই দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’
বন্যায় পার্বত্য এলাকায় সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতের ভোগান্তি হয় বান্দরবান জেলায়। ৭-১১ জুলাই এ জেলায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অনেক এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ওই সময় থানচি উপজেলায় একটানা ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ ছিল। এছাড়া রুমা উপজেলায় মুরং বাজার এলাকায় চলাচলের একমাত্র সড়কটি ধসে পড়াসহ টানা তিনদিন বিদ্যুৎ ছিল না। বর্তমানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও উপজেলার অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় সংযোগ ফিরে পাননি গ্রাহকরা।
বান্দরবানের প্রত্যন্ত এলাকা ছাড়াও বান্দরবান-কাপ্তাই সড়কের বিভিন্ন এলাকা, ভেদভেদি, কদুখোলা, মেঘলার দুটি এলাকা, লম্বারাস এলাকায় দুটি, তম্রুপাড়া, মধ্যমপাড়া, আর্মিপাড়া, উদালবনিয়া, কাইচতলী, বনানী স’মিল, ওয়াপদা ব্রিজ, হাফেজ ঘোনা, মেম্বার পাড়া, বীর বাহাদুর নগর, চেমি দুলুপাড়া, রাজভিলা, ট্যাংখালী, উজানিপাড়া, কসাইপাড়া, কাশেমপাড়া, গোয়ানিয়া খোলা, ভাগ্যকুলপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। বৃষ্টিপাত কমে এলে সংযোগ দেয়া শুরু হলেও এখনো অনেক গ্রাহক বিদ্যুতের বাইরে রয়েছেন।
যোগাযোগ করা হলে পিডিবি রাঙ্গামাটির পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার মোহন্ত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানা বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধসে পার্বত্য এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রাখা কঠিন একটি কাজ। বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়া, পাহাড়ধস ও প্রত্যন্ত নিচু এলাকায় বন্যার কারণে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল পার্বত্য তিন জেলার অনেক এলাকা। আমাদের কর্মীরা রাত-দিন কাজ করে সংযোগ স্বাভাবিক করেছে। রোববার থেকে ৯০ শতাংশের বেশি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ এসেছে। তবে কিছু দুর্গম এলাকায় কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন গ্রাহক পর্যায়ে সংযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি।’
পার্বত্য তিন জেলা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিপাত শুরু হলে পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় ভূমিধস হয়। এর মধ্যে পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কে ভাঙন ও সড়ক ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটিগুলো সড়কসংলগ্ন হওয়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আবার অনেক স্থানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলেও পিডিবির কর্মীরা যথাসময়ে কাজ শুরু করতে পারেননি। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের যানবাহন ছাড়াই বিকল্প পথ, নৌপথ ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে হয়েছে। যার কারণে টানা বৃষ্টিপাতের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় বিচ্ছিন্ন সংযোগ চালু করতে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। মোবাইল নেটওয়ার্কও না থাকায় স্থানীয়দের দুর্ভোগ আরো বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টির ফলে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় মোবাইলের নেটওয়ার্কও বিঘ্ন ঘটে। ফলে বন্যা ও ভূমিধসের ফলে আক্রান্ত মানুষ যোগাযোগ স্থাপন করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে দৈনিন্দন কাজ, গ্রামীণ হাট-বাজারগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা এসে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিলেও পিডিবির বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পার্বত্য এলাকায় দীর্ঘসময় ধরে বৃষ্টিপাত হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বন্যা, পাহাড়ধসের কারণে বৈদ্যুতিক খুঁটি বিচ্ছিন্নের হার ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। পাহাড়ধসের কারণে যথাসময়ে সংকটে পড়া এলাকায় যেতে না পারায় ভোগান্তির সময় বেড়েছে। রোববার থেকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় আমরা পুরোদমে কাজ শুরু করেছি। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া প্রায় সব উপজেলা ও গ্রামে সংযোগ দেয়া হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে কয়েক দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’


