
সরবরাহ সংকটে দাম বাড়ছে শুকনো খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের
জুলাই ১৩, ২০২৬
রফতানি পণ্যে দেশীয় সুতা-কাপড় ব্যবহারে নগদ সহায়তা বেড়ে ৫%
জুলাই ১৩, ২০২৬টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় প্লাবিত হয়েছে বাঁশখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ছয় উপজেলার তিন শতাধিক গ্রাম। আকস্মিক বন্যায় ঘরবন্দি প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।
প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত বন্যা, ভূমিধস সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে আরো ৩৯ জন। চলমান দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন। আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ।
এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় নদ-নদীর পানি বেড়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
চলমান বন্যা ও ভূমিধসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হলেও সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাঁশখালীতে। এ পরিস্থিতির জন্য ভারি বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পাশাপাশি অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও স্থানীয় নদী-খাল দখলকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা ও বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে মাছ ও লবণের ঘের রক্ষায় স্লুইস গেট বন্ধ রেখে ও বাঁধ দিয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলেও অভিযোগ তাদের।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম উপজেলা বাঁশখালী তুলনামূলক উঁচু এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এবার ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়েছে। টানা চারদিনের বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ১৭৬ কোটি ৮২ লাখ টাকার সম্পদ। স্থানীয়রা বলছেন, এটি ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর উপজেলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা। এজন্য বাঁশখালীর পূর্ব পাশের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ, বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অপরিকল্পিত সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণ ও স্থানীয় সাঙ্গু নদের পাশাপাশি জলকদর খাল, বড় গুনাগরী ছড়া, চাম্বল ছড়াসহ প্রায় সব খালের ৮০ শতাংশ দখলকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানান, বাঁশখালীর অন্যতম খাল জলকদর ২০০ ফুট প্রশস্ত হলেও দখল আর ভরাটে এখন ২০ ফুটে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি স্থাপনা ও বাড়িঘর নির্মিত হয়েছে। এছাড়া গুনাগরী ছড়ার ৯০ শতাংশই দখল হয়ে গেছে। খাল দখল করে নির্মিত হয়েছে বসতভিটা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নানা অবকাঠামো। তাদের দাবি, সরকারিভাবে নতুন খাল খনন ও বেদখল হওয়া খাল উদ্ধার করা না গেলে ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।
বাঁশখালীর গুনাগরীর বাসিন্দা ও বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাঁশখালীতে ১৯৯১ সালের বন্যার পর সবচেয়ে বড় বন্যা হচ্ছে এবার। ওই বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি থাকলেও এবার মানুষের জানমালের ক্ষতি বেশি হয়েছে। বন্যায় মানুষের ধান, লবণ ও মাছ ভেসে গেছে। বন্যার এ ভয়াবহতার কারণ মূলত সাঙ্গু নদ, জলকদর খাল ও গুনাগরী বড় ছড়া বেদখল। অথচ পুরো উপজেলার সবচেয়ে উন্নত গ্রাম গুনাগরী। ২০০১ সালের দিকে মডেল গ্রাম ঘোষণা করা হয়েছিল। কোনো পরিকল্পনা ছাড়া মানুষ বসত গেড়েছে, নানা স্থাপনা তৈরি করেছে। পাহাড়ের পাশে হওয়া সত্ত্বেও পাঁচদিনেও পানি নেমে যেতে পারছে না। খাল দখল করে স্থাপনাগুলোর কারণে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। পানি বের হওয়ার স্লুইস গেটগুলো ইজারা দেয়ার কারণে ইজারাদাররা জাল পেতে মাছ ধরছে। এ কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর নাব্যতা হারানো ও বেদখলের কারণে বাঁশখালীর আজকের এ অবস্থা। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহতার শিকার হতে হবে এ উপজেলার মানুষকে।’
টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গতকাল তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। গ্রিন রোডে স্কুটি নিয়ে চলাচলের সময় দুর্ভোগে পড়েন এক নারী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এবারের ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ এ অঞ্চলের প্রধান দুই নদ-নদী সাঙ্গু ও মাতামুহুরী ভরাট করে বাঁধ নির্মাণ, মৎস্য চাষের জন্য বেড়া দেয়া ও চর এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্যমতে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি দখল হয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে বালি ও পাথর উত্তোলন, নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, মাছ ধরতে বেড়া দিয়ে বাঁধ নির্মাণ এবং এসব নদ-নদীর শাখা খাল ও পাহাড়ি ছড়াগুলো দখলের ফলে সামান্য বৃষ্টিতে অনেক এলাকা তলিয়ে যায়। সংস্থাটির দাবি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময় রাখা হয়নি পানি চলাচলের পথ।
এ বিষয়ে বাপা চট্টগ্রামের সহসভাপতি ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আমরা প্রকৃতিকে বিরক্ত করে, জলবায়ুর বিপরীতে গিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করেছি। পানির গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছি। ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন করার কারণে কর্ণফুলী, সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর নাব্যতা নষ্ট হয়েছে। অনেক অংশ দখল হয়ে গেছে। এ কারণে পানি ধারণক্ষমতা নেই। যখন পাহাড়ে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে, সেটার প্রভাব সরাসরি লোকালয়ে পড়ছে।’
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এর আগে বাঁশখালীতে এত ভয়াবহ বন্যা হয়নি, যার কারণে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি একটু বেশি হয়েছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে এ পরিস্থিতি হয়েছে। এখানে অনেক অপরিকল্পিত অবকাঠামো হয়েছে, খাল দখল হয়েছে। এগুলোর কারণে পানি নিষ্কাশন দ্রুত হচ্ছে না। আমরা উপজেলার ৮৬টি স্লুইস গেট খুলে দিয়েছি। এর মধ্যে অনেকগুলোই বেশ পুরনো। আমরা সুপারিশ করেছি এগুলোকে বর্তমান সময়ের উপযোগী করে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা এতটাই বেড়ে গেছে যে স্লুইস গেট দিয়ে পানি বের করে দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে আমরা কয়েকটি স্থানে রাস্তা ও বেড়িবাঁধ কেটে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করেছি। তবে এখনো লাখ খানেক মানুষ পানিবন্দি। সকালে ভারি বৃষ্টিপাত না হলে এ অবস্থার আরো উন্নতি করা সম্ভব হতো।’
সাধারণত দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের পাহাড়ি ঢল সাঙ্গু ও মাতামুহুরী দিয়ে মহেশখালী চ্যানেলের মধ্য হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। ১৪৬ কিলোমিটার মাতামুহুরী নদীর ৪০ কিলোমিটার পড়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায়। এ নদীর প্রায় ৪০ শতাংশই দখল করেছে স্থানীয়রা। বসতভিটার পাশাপাশি অবৈধ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া মাছের ঘের করতে বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে।
পেকুয়ার বাসিন্দা কবির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব স্লুইস গেট ও জলমহাল ইজারামুক্ত রাখার কথা বললেও একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জলমহালগুলো দখল করে মাছ চাষ করেছে। জনগণের চাপে কয়েকবার খুলে দেয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। জোয়ার ছাড়া বাকি সময় খোলা রাখলে পানি নেমে যাবে। অনেক জায়গায় মানুষ বিভিন্ন রাস্তা ও বাঁধ কেটে পানি নামার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কেউ যদি এমন কিছু করে তাহলে সেখানে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। কক্সবাজারের তিন উপজেলার আড়াই লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূলত অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আশা করছি দুই-তিনদিনের মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।’
অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অকার্যকর বাঁধ ও নদী দখলের কারণে বন্যার এ পরিস্থিতি বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বন্যার কারণ পাহাড়ি ঢল ও জলবায়ু পরিবর্তন। সঠিক ভূমি ব্যবস্থাপনার অভাবে বৃষ্টির কারণে বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জলাভূমি, খাল, নদী দখলের কারণে জলাধার পেরিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আবার যত্রতত্র বালি ও পাথর উত্তোলন, অকার্যকর স্লুইস গেটের কারণে পানি বের হতে পারছে না। মাছ ধরার জন্য প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাঁধ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।’
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ৫ জুলাই থেকে ওড়িশা উপকূলে সৃষ্ট নিম্নচাপের ফলে বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপ বেড়ে যাওয়ায় ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এটি টানা কয়েক দিন চলমান থাকায় এবং পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ভারি বর্ষণের কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাঙ্গু, মাতামুহুরীর তীরের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে গতকাল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় নদ-নদীর পানি বেড়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় বেড়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে এসব জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর পানি কমতে পারে। এতে এসব নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


