আবাসস্থলে আহত বাঘিনীকে ফিরিয়ে দিতে পারাকে ‘মাইলফলক’ বলছেন সংশ্লিষ্টরা
জুলাই ১৩, ২০২৬
অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও নদী-খাল দখলে ডুবছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম
জুলাই ১৩, ২০২৬
আবাসস্থলে আহত বাঘিনীকে ফিরিয়ে দিতে পারাকে ‘মাইলফলক’ বলছেন সংশ্লিষ্টরা
জুলাই ১৩, ২০২৬
অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও নদী-খাল দখলে ডুবছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম
জুলাই ১৩, ২০২৬

সরবরাহ সংকটে দাম বাড়ছে শুকনো খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের

এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ অবস্থায় পাইকারি বাজারে চাহিদা কম থাকলেও প্রান্তিক অঞ্চলগুলোয় সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নিত্যপণ্য ও শুকনো খাদ্যের বাজারে প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে চিড়া, মুড়ি, সেমাইসহ শুকনো খাদ্যের দাম বেড়েছে।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আছদগঞ্জ। এ বাজার থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চল ছাড়াও সারা দেশে পণ্য সরবরাহ হয়। পাইকারি বাজার ও বন্দরে পণ্য মজুদ থাকলেও বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা বাজারে আসতে পারছেন না। আবার চাহিদা থাকলেও পণ্য পাঠাতে বিলম্ব ও বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এ কারণে পাইকারি বাজারে সীমিত দাম বাড়লেও খুচরায় শুকনো খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি বা দীর্ঘ হলে ভোগ্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা বৃষ্টিপাত ও চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি শুরু হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী পাইকারি বাজারে আসতে পারছেন না। অনেকেই পণ্য কিনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য নিতে পারছেন না। পাইকারি বাজারে দাম না বাড়লেও প্রতি বস্তা পণ্যের পরিবহন খরচ ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বৃষ্টিপাতের কারণে পণ্য লোডিং-আনলোডিংয়ে ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের বাজারগুলোয় নিত্যপণ্যের দাম কেজিপ্রতি ১-২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ভোগ্যপণ্যের বাজার বন্যা ও বৃষ্টিপাতের কারণে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

খাতুনগঞ্জের ‘মেসার্স হক ট্রেডিং’-এর স্বত্বাধিকারী আজিজুল হক বণিক বার্তাকে জানান, পাইকারি বাজারে ক্রেতাদের আনাগোনা কম। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বাজারে আসতে পারছেন না। পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে পণ্যের দাম কিছুটা বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। ডাল, চাল, ভোজ্যতেল, চিনিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল থাকলেও শুকনো খাবারের দাম কেজিপ্রতি ৩-৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বন্যার কারণে এসব পণ্যের বাড়তি চাহিদায় দাম বাড়লেও এটা সাময়িক।

জানা গেছে, টানা বৃষ্টিতে বন্যার কারণে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও কক্সবাজারে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া এবং সড়কের ভাঙনে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক কেরানীহাট হয়ে বান্দরবানে যাতায়াতের প্রধান রুট। কেরানীহাট থেকে বান্দরবান পর্যন্ত পাহাড়ি সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়াসহ সড়কে পাহাড় ধসে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই উপজেলা, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় যাতায়াতে বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের প্রতিবন্ধকতা স্বাভাবিক সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। এ কারণে বন্যা পরিস্থিতিতে মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের বাজার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বন্যা ও বিরূপ আবহাওয়া বিলম্বিত হলে ভোগ্যপণ্যের বাজার আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

গতকাল খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে নিত্যপণ্যের চাহিদা ও দাম স্থিতিশীল থাকলেও চিড়া, সেমাই (খোলা), মোমবাতি, শুকনো খেজুর, বিস্কুট, নুডলসের চাহিদা বেশি বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রতি বস্তা (২৫ কেজি) সাধারণ মানের চিড়ার দাম ১০০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকায় লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে কেজিপ্রতি মুড়ির দাম ২-৩ টাকা বেড়ে ৬৫-৬৮ টাকায় (মানভেদে) বিক্রি হচ্ছে। খোলা সেমাইয়ের দাম প্রতি টুকরি (৩০ কেজি) ৯০০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একইভাবে পাইকারি পর্যায়ে শুকনো খেজুরের দাম মানভেদে ২০-৩০ টাকা বেড়ে কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ৩০০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।

চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের মেসার্স সাহা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী গণেশ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৃষ্টি ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপে পণ্যবাহী ট্রলার আসছে খুবই কম। এ কারণে চাইলেও পর্যাপ্ত পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে সেগুলো দিয়ে সরবরাহ মেটানো সম্ভব হবে। বৃষ্টি ও সমুদ্র উত্তাল থাকায় পণ্য সংগ্রহে বস্তাপ্রতি খরচ ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।’ ফলে পাইকারি পর্যায়ে কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি করলেও খুচরায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা থাকে না। গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্যা ও বিরূপ আবহাওয়ায় রান্নার পরিবর্তে মানুষের মধ্যে শুকনো খাদ্য গ্রহণের হার বেশি। এ কারণে পাইকারি বাজারে ডাল, চাল, ভোজ্যতেল, চিনির চাহিদা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়েনি। তবে বন্যা পরিস্থিতিতে আটা-ময়দার চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য না বাড়লেও খুচরায় বন্যাকবলিত এলাকায় আটা-ময়দার দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। মূলত পাইকারি বাজার ও ফ্লাওয়ার মিলগুলো থেকে পণ্য সংগ্রহে বিড়ম্বনা, টানা বৃষ্টিতে পরিবহন অবস্থায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া এবং পরিবহন খরচ বেড়ে দামে প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। আবার শুকনো খাদ্য ত্রাণ হিসেবে সংগ্রহের কারণেও পাইকারি বাজারে দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট এলাকার মেসার্স মালতী এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার সঞ্জয় দে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানি বন্ধের পর চালের দাম কেজিপ্রতি ৩-৫ টাকা বেড়েছে। বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে কিছু বিশেষ পণ্যের সরবরাহ ও দামের পরিবর্তন হয়েছে। চিড়া, গুড়, মুড়ি, সেমাইয়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।’ তবে পাইকারি বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ না বাড়লেও দুর্গত এলাকায় পরিবহন খরচ ও সরবরাহের কারণে দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিন তেল লেনদেন হচ্ছে ৭ হাজার ৩০০ টাকায়, পাম অয়েল ৬ হাজার ৩৫০, সুপার পাম অয়েল ৬ হাজার ৫৫০ ও চিনি ৩ হাজার ৬২০ টাকায়। অন্যদিকে পেঁয়াজ মানভেদে কেজিপ্রতি ২৫-৩২ টাকায়, মোটা মসুর ডাল ৮০, চিকন জাতের মসুর ১৪৮-১৫০, মুগডাল মোটা ১১৪-১১৫, চিকন মুগডাল ১৪৮-১৫০, ভারতীয় মাঝারি আকারের মুগডাল ১২০-১২২ ও মটর ডাল (অ্যাংকর) ৪৩-৪৫ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। পাইকারি বাজারে এসব পণ্যের দাম অনেকটা স্থিতিশীল থাকলেও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খুচরায় আগের তুলনায় কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *