
দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও মেসির পায়ে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন
জুলাই ৮, ২০২৬
লুটপাটের সুযোগ দিতে ছাত্র-জনতা রক্ত দেয়নি: নাহিদ ইসলাম
জুলাই ৮, ২০২৬গ্রিক পুরাণে থেটিস তার পুত্র অ্যাকিলিসকে অমরত্ব দিতে চেয়েছিলেন। স্টিক্স নদীর জলে চুবিয়েছিলেন সদ্যোজাত শিশুকে, শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি অভেদ্য করে তুলেছিলেন তরবারির আঘাত থেকে।
কিন্তু যে গোড়ালি ধরে মা তাকে নদীতে নামিয়েছিলেন, সেই একটুখানি জায়গা রয়ে গিয়েছিল অস্পর্শিত। ট্রয়ের যুদ্ধে সেই এক বিন্দু দুর্বলতাই কেড়ে নিয়েছিল গ্রিসের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাকে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ফুটবল-জীবনও যেন সেই মিথেরই আধুনিক পুনর্লিখন। ফুটবলের ইতিহাসে তিনি প্রায় অজেয়, প্রায় অমর। রেকর্ডের পর রেকর্ড ভেঙে, বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, গোলের সংখ্যায় ইতিহাসের চূড়ায় বসে আছেন এক অবিসংবাদিত সম্রাটের মতো। কিন্তু বিশ্বকাপ? সেখানে যেন তার ব্যক্তিগত মহিমা দলগত নিয়তির কাছে নতজানু হতে বাধ্য হয়। আর্লিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে, সেই পুরনো ক্ষত আরো একবার রক্তাক্ত হলো, হয়তো শেষবারের মতো।
পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে তিনি অভ্রভেদী মিনার, যার ছায়ায় ঘুমিয়েছে পুরো জাতি, কিন্তু বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা যেন তার পায়ের কাছে এসেই থমকে দাঁড়িয়েছে বারবার। এ ট্রফিই কি রোনালদোর ‘অ্যাকিলিস হিল’? যেখানেই তিনি অজেয়, সেখানেই নিয়তি তাকে একটি মিলিমিটারের ব্যবধানে হার মানিয়েছে। গ্রিক বীর অ্যাকিলিসের পায়ের গোড়ালিতে যেমন ছিল তার নশ্বরতা, রোনালদোর ক্যারিয়ারের নশ্বরতা যেন বিশ্বকাপ ট্রফিটিই।
রোনালদো ইউরোপ জিতেছেন, জিতেছেন বহুজাতিক ক্লাব ফুটবলের প্রায় সব আকাশ। ভেঙেছেন গোলের প্রতিটি অংক, ছুঁয়েছেন এমন সব শিখর, যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষের চেয়ে দেবতার মতোই মনে হয় তাকে। অথচ চার বছর পরপর পৃথিবী যখন একটি ট্রফির চারদিকে ঘুরতে শুরু করেছে, তখনই যেন ভাগ্য তার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলেছে ‘এখানেই তোমার সীমারেখা।’ আর্লিংটন স্টেডিয়ামের ডিজিটাল ঘড়িতে অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিট, পর্তুগাল তখনো বিশ্বাস করছিল সময়কে আরেকটু ঠেলে দেয়া যাবে। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো নির্মমতার এমন ভাষা
বেছে নেয়, যার ব্যাকরণ মানুষ বোঝে না। মিকেল মেরিনোর গোলটি ছিল যেন ট্রয়ের প্রাচীর ভেদ করে ঢুকে পড়া শেষ তীর। এক মুহূর্তে নিভে গেল ছয়টি বিশ্বকাপ ধরে বহন করা একটি স্বপ্ন।
ফুটবল ইতিহাসে এমন চরিত্র নতুন নয়। ইয়োহান ক্রুইফ বিশ্বকাপ জেতেননি। আলফ্রেডো ডি স্তেফানো কখনো বিশ্বকাপ খেলতেই পারেননি। ফেরেঙ্ক পুসকাসের হাতেও ওঠেনি সেই সোনালি ট্রফি। জর্জ বেস্ট বিশ্বকাপের আলোই দেখেননি। কিন্তু রোনালদোর অপূর্ণতা অন্য রকম। কারণ তিনি বারবার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, বারবার হাত বাড়িয়েছেন, কিন্তু দরজাটি প্রতিবারই তার মুখের ওপর বন্ধ হয়ে গেছে। সংখ্যা অবশ্য কার্পণ্য করেনি তার প্রতি। ২৩৩ ম্যাচ, ১৪৬ গোল—এই দুটি অংক পর্তুগালের জার্সিতে খোদাই হয়ে আছে পাথরে লেখা শিলালিপির মতো, অক্ষয়। বিশ্বকাপে খেলেছেন ২৭ ম্যাচ, মেসির পরই সর্বোচ্চ। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন মেসি আর ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে, কিন্তু একটি জায়গায় তিনি নিঃসঙ্গ, অতুলনীয়, একা এক দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে: প্রতিটি বিশ্বকাপেই অন্তত একবার জাল কাঁপিয়েছেন তিনি, পৃথিবীর আর কোনো ফুটবলার যা পারেননি। ২০০৬ সালে একুশ বছরের এক তরুণ প্রথম বিশ্বকাপে এসেছিলেন। পর্তুগাল উঠেছিল সেমিফাইনালে। তখন কে জানত, সেটিই হবে বিশ্বকাপে তার সবচেয়ে দূরের যাত্রা? এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—প্রতিটি বিশ্বকাপ যেন অসমাপ্ত চিঠি।
তবু তিনি কখনো থামেননি। ব্যর্থতা তাকে ভেঙেছে, কিন্তু ভাঙা কাচের মতো আরো ধারালো করে তুলেছে। যে বয়সে অধিকাংশ ফুটবলার স্মৃতিচারণ লেখেন, সেই বয়সে তিনি এখনো স্প্রিন্ট দিয়েছেন, প্রেস করেছেন, লড়েছেন, প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে পরীক্ষা নিয়েছেন। আর্লিংটনের রাতেও তিনি তিনবার শট নিয়েছেন। একটি শটে উনাই সিমনের আঙুলের ডগা তাকে গোলবঞ্চিত করেছে। হয়তো ভাগ্যও সেদিন গোললাইনেই দাঁড়িয়ে ছিল। রোনালদোকে অনেকেই অহংকারী বলেছেন। অনেকেই বলেছেন তিনি নিজের গল্পের নায়ক হতে চান। হয়তো সত্যিও আছে। কিন্তু প্রতিটি মহাকাব্যেরই তো একজন নায়ক থাকে। পার্থক্য শুধু এসব নায়ক বিজয়ী হয় না। হোমারের অ্যাকিলিস যেমন অমর হয়েছিলেন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, রোনালদোও হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তার অপূর্ণতার জন্য। কারণ পরিপূর্ণ মানুষ ইতিহাসে জায়গা পায়, অপূর্ণ মানুষ জায়গা পায় মানুষের হৃদয়ে।
ম্যাচ শেষে তার কণ্ঠ কেঁপেছিল। কিন্তু মাথা নত হয়নি। তিনি বললেন, ‘আমি পরিষ্কার বিবেক নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। আমি আমার সবটুকু দিয়েছি।’ এ একটি বাক্যের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে তার সমগ্র জীবনদর্শন। বিজয় মানুষকে আনন্দ দেয়, কিন্তু আত্মসমর্পণ না করা মানুষকে মহৎ করে। পর্তুগাল তার আগে কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেনি। তিনি এনে দিয়েছেন ইউরো, এনে দিয়েছেন দুটি নেশনস লিগ। বিশ্বকাপ না জিতেও তিনি পর্তুগিজ ফুটবলের সবচেয়ে উঁচু পর্বত। তবু মানুষের মন বড় নিষ্ঠুর। শেষ পর্যন্ত সবাই একটি প্রশ্নই করবে—বিশ্বকাপ কোথায়? সম্ভবত এ প্রশ্নের উত্তর কোনো দিন মিলবে না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘যাহা পাই নাই, তাহাই যেন সবচেয়ে বেশি।’ রোনালদোর ক্যারিয়ারও যেন সেই না-পাওয়ার দীপ্ত উদাহরণ।
আরলিংটনের ঘাসে যে জল ঝরল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চোখ থেকে, তা কেবল একটি হারের কান্না নয়—তা এক জীবনভর সাধনার শেষ পঙ্ক্তি। এক অ্যাকিলিসের শেষ পতন, যার বর্ম ছিল অভেদ্য, কিন্তু গোড়ালিটুকু চিরকাল রয়ে গেল খোলা, অরক্ষিত, নিয়তির তীরের অপেক্ষায়। ইতিহাস তাকে মনে রাখবে কিংবদন্তি হিসেবেই। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় উপমাটি লেখা থাকবে অন্য কোথাও—যেমন অ্যাকিলিসকে অমর করেও তার গোড়ালিটুকু রক্ষা করা যায়নি, তেমনি ফুটবল রোনালদোকে প্রায় সবকিছু দিয়েছে, শুধু বিশ্বকাপটুকু নয়। সেই না পাওয়াই হয়ে রইল তার চিরন্তন অ্যাকিলিস হিল।


