
মিশরের বিতর্কিত গোল বাতিল, কী আছে ফিফার আইনে?
জুলাই ৮, ২০২৬
বিশ্বকাপই রোনালদোর ‘অ্যাকিলিস হিল’
জুলাই ৮, ২০২৬ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত আটলান্টার আকাশে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিল ফারাওদের জয়গাথা। দুই গোলে পিছিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
পেনাল্টি মিস করে মেসি তখন ট্র্যাজিক হিরো, আর মিসরের গোলকিপার যেন গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ওদিকে মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বে একের পর এক বিদ্যুৎগতির কাউন্টার অ্যাটাকে লণ্ডভণ্ড স্কালোনির রক্ষণভাগ। গ্যালারি জুড়ে তখন একটাই ফিসফাস—বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অঘটন কি তবে ঘটেই গেল? ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দুই পরাশক্তিকে ছাড়াই হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল? আফ্রিকান ফুটবলের নতুন এক অমর মহাকাব্য লিখতে চলেছে মিসর?
ঠিক তখনই ধ্বংসস্তূপের ছাই ভেদ করে ডানা মেলল আলবিসেলেস্তে ফিনিক্স। কোনো একক জাদুকরের কাঁধে ভর করে নয়, আর্জেন্টিনার এ পুনরুত্থান তিন যোদ্ধার সম্মিলিত মরণকামড়ে। ম্যাচের সমস্ত স্থবিরতা ভেঙে প্রথম আগুন জ্বালালেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, মেসির ক্রস থেকে তার বুলেট হেডারে যেন প্রাণ ফিরে পেল স্তব্ধ গ্যালারি। এরপর মঞ্চে সেই চেনা জাদুকর; পেনাল্টি মিসের দায় চুকিয়ে প্রথম জালের ঠিকানা খুঁজে নিলেন লিওনেল মেসি। ম্যাচের ভাগ্যলিপি যখন পেন্ডুলামের মতো দুলছে, তখন মিসরের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন এনজো ফার্নান্দেজ।
মাত্র ১৪ মিনিটের টর্নেডো! তিন-তিনটি গোল। অবিশ্বাস, বিস্ময় আর আবেগের সব সীমানা ভেঙে ৩-২ ব্যবধানের এক অতিমানবিক জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটল আর্জেন্টিনা। রেফারির শেষ বাঁশি যখন বাজল, আটলান্টার মাঠে তখন একদিকে বাঁধভাঙা উল্লাস, অন্যদিকে বুকভাঙা হাহাকার। তবে পরাজিত মিসরও মাঠ ছাড়ল মাথা উঁচু করেই। তারা হেরেছে বটে, কিন্তু বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ইতিহাসের সবচেয়ে অগ্নিপরীক্ষায় ফেলে। তবে এ মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন ঘিরে রয়েছে বিতর্কের ছাপ। জয়সূচক গোলের ঠিক আগে সালাহকে আলভারেজের চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয়ার ঘটনায় পেনাল্টির জোরালো দাবি তোলে মিসর, যা নাকচ করে দেন রেফারি। আর এর আগেই জিকোর একটি গোল ভিএআরে বাতিল হওয়াও ম্যাচজুড়ে ক্ষোভের খোরাক হয়ে থাকে।
শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার হাতে। বল দখল, ছোট ছোট পাস, দুই প্রান্ত বদলে আক্রমণ—সবই ছিল স্কালোনির দলের পরিকল্পনায়। কিন্তু ম্যাচের ১৫ মিনিটে প্রথম কর্নার থেকেই চমকে দেয় মিসর। মারওয়ান আতিয়ার নিখুঁত ডেলিভারিতে ইয়াসের ইব্রাহিম ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে হারিয়ে জোরালো হেডে বল পাঠিয়ে দেন জালে। একটি সুযোগ, একটি নিখুঁত আঘাত আর তাতেই ১-০ এগিয়ে যায় ফারাওরা। তবে বিপদে পড়েও দ্রুত ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ১৯ মিনিটে বক্সে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে ফাউল করায় পেনাল্টি দেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। পুরো স্টেডিয়াম তখন দাঁড়িয়ে। কিন্তু মেসির নিচু শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবেইর। বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির চতুর্থ পেনাল্টি মিস, আর চলতি আসরে দ্বিতীয়। এক মুহূর্তে যেন পুরো ম্যাচের গতি পাল্টে যায়।
এরপর শুরু হয় শোবেইরের একক প্রদর্শনী। ম্যাক অ্যালিস্টারের কাছ থেকে নিশ্চিত গোল বাঁচান, আলভারেজের ভলি ঠেকান, মেসির ফ্রি-কিক পোস্ট ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র। আর্জেন্টিনা আক্রমণ করছে, মিসর অপেক্ষা করছে পাল্টা আক্রমণের। ৫৮ মিনিটে জিকো আবারো বল জালে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু অনেকটা আগে আতিয়ার ফাউলের কারণে ভিএআরে গোল বাতিল হয়। আর্জেন্টিনা যেন দ্বিতীয় জীবন পায়। কিন্তু সেটাও বেশিক্ষণ টেকেনি।
৬৭ মিনিটে আবারো কর্নার থেকে বিপদ। এবার মেসির কর্নার ক্লিয়ার করেই বজ্রগতির পাল্টা আক্রমণ শুরু করে মিসর। সালাহ মাঝমাঠে বল ধরে অপেক্ষমাণ হাসানকে দেন। ডান দিক দিয়ে ছুটে গিয়ে হাসান নিচু ক্রস ফেরান। বক্সে ঢুকে আসা জিকো এবার আর কোনো ভুল করেননি। বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে ব্যবধান ২-০।
আটলান্টার গ্যালারিতে তখন নিস্তব্ধতা। ক্যামেরা বারবার চলে যাচ্ছিল মেসির মুখে। তিনি দুই হাত কোমরে রেখে দূরে তাকিয়ে। যেন বুঝে গেছেন বিশ্বকাপ স্বপ্ন এখানেই শেষ হতে চলেছে। কিন্তু এরপর মাস্টারমাইন্ড স্কালোনির দাবার ছক। মাঠে আসেন লাউতারো মার্তিনেজ, নিকো গনসালেস, মন্তিয়েল। আর্জেন্টিনা চারজন ফরওয়ার্ড নিয়ে প্রায় সর্বাত্মক আক্রমণে চলে যায়। পেছনে থেকে যান শুধু দুই সেন্টারব্যাক আর পারেদেস। শুরু হয় অন্য এক ম্যাচ।
৭৮ মিনিটে মেসি ডান দিক থেকে এমন একটি ক্রস তুললেন, যা শুধু দেখা যায়, আটকানো যায় না। সামনে ছুটে আসা ক্রিস্টিয়ান রোমেরো দুর্দান্ত হেডে গোল করেন। গোল করেই বল কুড়িয়ে নিয়ে মাঝমাঠে ছুটে যান তিনি। উদযাপনের সময় নেই। সমতা ফেরাতে তখনো একটি গোলের ঘাটতি।
রোমেরোর গোল বদলে দেয় পুরো ম্যাচের মানসিক চিত্র। এতক্ষণ যাদের আত্মবিশ্বাস পাহাড়সম ছিল, সেই মিসরীয়রা হঠাৎ করেই রক্ষণে গুটিয়ে যায়। আর আর্জেন্টিনা যেন বিশ্বাস করতে শুরু করে—অসম্ভবও সম্ভব। ৮৩ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত।
মেসি বাম দিক থেকে আক্রমণ গড়ে তোলেন। লাউতারো মার্তিনেজের অ্যাক্রোবেটিক চেষ্টায় বল পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে পারেননি মিসরের ডিফেন্ডাররা। পিঠ গোলের দিকে রেখে বল নিয়ন্ত্রণে রাখেন গঞ্জালো মন্তিয়েল। এক টাচেই বল বাড়িয়ে দেন মেসির সামনে। বক্সের ভিড়ের মধ্যে বাঁ পায়ের জোরালো শট নেন মেসি। শোবেইরের গ্লাভস ছুঁয়ে বল জালে জড়িয়ে যায়। যিনি প্রথমার্ধে পেনাল্টি ঠেকিয়ে নায়ক হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাকেই পরাস্ত করেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। স্কোরলাইন ২-২।
স্টেডিয়াম আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। ম্যাচ তখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু মেসিরা যেন থামতে রাজি নন। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে মিসর কর্নারের আশায় আক্রমণে উঠে আসে। ঠিক তখনই পারেদেস অসাধারণ ট্যাকলে বিপদ সামলে দেন। মুহূর্তের মধ্যে পাল্টা আক্রমণ। বল যায় লাউতারো মার্তিনেজের কাছে। ডান দিক দিয়ে এগিয়ে তিনি নিখুঁত একটি ক্রস তোলেন। বক্সে তখন মাত্র দুই আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়। কিন্তু তাদের একজন এনজো ফার্নান্দেজ। দুর্দান্ত টাইমিংয়ে উঠে হেড করেন চেলসি মিডফিল্ডার। বল জড়িয়ে যায় জালে।
তবে জয়সূচক গোলটি নিয়ে মাঠে উত্তেজনা দেখা দেয়। আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণ শুরুর মুহূর্তেই বক্সের ভেতরে সালাহ আলভারেজের চ্যালেঞ্জে পড়ে গেলে পেনাল্টির জোরালো দাবি জানায় মিসর। কিন্তু রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে খেলা চালিয়ে যান। সেই সিদ্ধান্তই মিসরীয়দের ক্ষোভ আরো বাড়ায়। তাদের দাবি, আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগেই খেলা থামা উচিত ছিল। ফলে বিতর্কের ছায়া নিয়েই স্কোরবোর্ডে জ্বলে ওঠে আর্জেন্টিনার ৩-২ ব্যবধান।
ম্যাচের বাকি সময়টা জুড়ে বিরাজ করে তীব্র উত্তেজনা। মিসরের কোচিং স্টাফের একজন লাল কার্ড দেখেন। একাধিক খেলোয়াড় হলুদ কার্ড পান। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা দৌড়ে যান এনজো ফার্নান্দেজের দিকে। কিছুটা দূরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন মেসি। মুখ ঢেকে ফেলেন দুই হাতে। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ মুছতে দেখা যায় তাকে। কিছুক্ষণ আগেও যার মুখে ছিল অসহায়ত্ব, সেই মানুষটির চোখেই তখন আনন্দের জল। যে দলটিকে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত মৃতপ্রায় মনে হচ্ছিল, সেই দলই ১৪ মিনিটের উন্মত্ত ঝড়ে নতুন জীবন খুঁজে পেল। আর মিসর? তারা বিদায় নিলেও রেখে গেল এমন এক লড়াই, যা পরাজয়ের পরও বহুদিন মনে থাকবে।


