মেরিনোর শেষ মুহূর্তের গোলে রোনালদোর পর্তুগালের বিদায়
জুলাই ৭, ২০২৬
প্রশাসনের সহায়তায় এনসিপির সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণর দাবি নাহিদের
জুলাই ৭, ২০২৬
মেরিনোর শেষ মুহূর্তের গোলে রোনালদোর পর্তুগালের বিদায়
জুলাই ৭, ২০২৬
প্রশাসনের সহায়তায় এনসিপির সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণর দাবি নাহিদের
জুলাই ৭, ২০২৬

মাঠে মেসি-সালাহ দ্বৈরথ, কৌশলে কেপ ভার্দে

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মহারণ। সবুজ গালিচায় মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন দুই ভিন্ন গোলার্ধের দুই ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি ও মোহাম্মদ সালাহ।

কিন্তু আটলান্টার এ ধ্রুপদি দ্বৈরথের দাবার ছকে নেপথ্যের নাম হিসেবে উঠে আসছে কেপ ভার্দে! শুনতে অবাক লাগলেও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য এটাই রূঢ় বাস্তব। রাউন্ড অব থার্টি টুতে এ ছোট্ট আফ্রিকান দেশটিই আলবিসেলেস্তেদের দুর্বলতার প্যান্ডোরার বাক্সটি সশব্দে খুলে দিয়েছে। মাঝমাঠের সমন্বয়হীনতা আর প্রতিপক্ষের ট্রানজিশনের সময় খেই হারিয়ে ফেলার যে দৃশ্য মিয়ামির মাঠে মঞ্চস্থ হয়েছে, ফারাওদের জন্য তা নিখুঁত রণকৌশলের নীলনকশা। নিশ্চিতভাবেই কেপ ভার্দের দেখিয়ে দেয়া পথেই লাতিন পরাশক্তিকে বোতলবন্দি করার ছক কষবে মিসর।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছেন মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি। খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসার শিল্পের চেয়ে বড় কোনো পাঠ্যবই তার কাছে নেই। কেপ ভার্দের বিপক্ষেই তিনি নিজেও তার দলের দুর্বলতার কদর্য রূপটি দেখে ফেলেছেন, আর এখন কেবলই তা শোধরানোর পালা। আজ রাত ১০টায় আটলান্টার মাঠে তাই লড়াইটা কেবল মেসি আর সালাহর নয়; এটি এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে কেপ ভার্দের ফেলে যাওয়া পদচিহ্ন ধরে মিসর খুঁজবে জয়ের দিশা, আর স্কালোনি চাইবেন সেই পদচিহ্ন মুছে ফেলে বিশ্বজয়ের মুকুট সুরক্ষিত রাখতে।

কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচের কৌশলগত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটির কোচ বুবিস্তা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ছক সাজিয়েছিলেন। ৪-৫-১ ফরমেশনে তারা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের প্রধান উৎস লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দি করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কেপ ভার্দে রক্ষণভাগে কেবল বাসের পার্কিং করেনি, বরং তারা মাঝমাঠে ফুটবলারদের ভিড় বাড়িয়ে আর্জেন্টিনার পাসিং লেনগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে মেসিকে বারবার নিজের চেনা পজিশন ছেড়ে নিচে নেমে বল রিসিভ করতে হচ্ছিল। এছাড়া আর্জেন্টিনার রক্ষণেও ফাঁক দেখিয়ে দিয়েছে কেপ ভার্দে। মিসরের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে এ ধরনের রক্ষণাত্মক ভুল এবং মাঝমাঠের সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে ওঠার জোর চেষ্টা করবেন স্কালোনি।

মিসর নিশ্চয়ই কেপ ভার্দের ম্যাচটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছে। হোসাম হাসানের দলও মূলত সংগঠিত রক্ষণ ও দ্রুত ট্রানজিশনের ওপর নির্ভরশীল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তারা অনেকটা সময় নিজেদের অর্ধে কাটিয়েছে। কিন্তু সুযোগ পেলেই মোহাম্মদ সালাহ ও ওমর মারমুশকে সামনে রেখে দ্রুত আক্রমণে উঠেছে। সেই ম্যাচ ১২০ মিনিট গড়িয়ে টাইব্রেকারে গেলেও মিসরের রক্ষণ ভাঙা সহজ হয়নি। বিশ্বকাপের নকআউটে প্রথম জয় তুলে নেয়ার আত্মবিশ্বাসও তাদের সঙ্গে আছে।

আর্জেন্টিনার জন্য উদ্বেগের জায়গাও কম নয়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে দেখা গেছে, ফুল-ব্যাকদের পেছনের ফাঁকা জায়গা বারবার কাজে লাগিয়েছে প্রতিপক্ষ। রায়ান মেন্ডেস ও সিডনি লোপেস কাবরালের গতি তাদের বিপাকে ফেলেছে। দুবার এগিয়েও সমতা ফেরানো তারই প্রমাণ। মাঝমাঠের প্রেসিংও দ্বিতীয়ার্ধে আগের মতো কার্যকর ছিল না। ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ক্লান্তি তত স্পষ্ট হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে কয়েকজন খেলোয়াড়ের পায়ে ক্র্যাম্প পর্যন্ত দেখা দেয়। মাত্র চারদিনের ব্যবধানে আবার ১২০ মিনিট খেলা মিসরের মুখোমুখি হতে হওয়ায় শারীরিক সক্ষমতার প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বিষয়টি নিয়ে আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা সার্জিও আগুয়েরোও সতর্ক করেছেন। তার মতে, কেপ ভার্দের চেয়েও মিসরের আক্রমণভাগে বেশি মানসম্পন্ন ফুটবলার রয়েছে। বিশেষ করে সালাহ থাকলে ম্যাচের চিত্র যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।

এ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনা করেছে ১১ গোল। এর মধ্যে সাতটি গোলই মেসির। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করে তিনি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ২০-এ তুলেছেন। দলের সবচেয়ে বড় ভরসা তিনি। তবে এটিও সত্য, আর্জেন্টিনার আক্রমণ অনেক বেশি মেসিনির্ভর হয়ে পড়েছে। লাউতারো মার্তিনেজ ধারাবাহিক নন, বদলি হিসেবে নেমে হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা নিকোলাস গনজালেসও প্রত্যাশিত প্রভাব রাখতে পারেননি। তাই স্কালোনি একাদশে পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আলভারেজ, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকো শুরু থেকেই খেলতে পারেন। পারেদেস নামলে মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, আর আলভারেজের অবিরাম প্রেসিং মিসরের বিল্ডআপে চাপ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে মিসরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সালাহর শারীরিক অবস্থা। হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেললেও তাকে শতভাগ ফিট মনে হয়নি। অনেক সময় পূর্ণগতিতে দৌড়াননি। কিন্তু সালাহ সবসময় বেশি বল ছুঁয়ে ম্যাচ বদলান না। কখনো একটি দৌড়, একটি কাটব্যাক বা একটি নিখুঁত ফিনিশই যথেষ্ট। আর্জেন্টিনা যদি ফুল-ব্যাকদের অনেক ওপরে তোলে, সেই ফাঁকা জায়গাই হতে পারে সালাহর সবচেয়ে প্রিয় শিকারক্ষেত্র।

এ ম্যাচকে শুধু মেসি বনাম সালাহ বললে অবশ্য ভুল হবে। প্রকৃত লড়াই হবে মাঝমাঠে। এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল ও পারেদেস যদি বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে মিসরকে দীর্ঘ সময় রক্ষণে কাটাতে হবে। কিন্তু মিসর যদি কেপ ভার্দের মতো পাসিং লেন বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে আর্জেন্টিনা আবারো দীর্ঘ বল ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

সেট-পিসও হতে পারে বড় ফ্যাক্টর। কেপ ভার্দের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি এসেছে মেসির কর্নার থেকে। স্কালোনি পরে বলেছেন, এ পরিস্থিতি নিয়ে তারা আলাদা করে কাজ করেছিলেন। মিসরের মতো শারীরিকভাবে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে কর্নার ও ফ্রি-কিক আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একইভাবে আর্জেন্টিনাকেও সতর্ক থাকতে হবে নিজেদের বক্সে অপ্রয়োজনীয় ফাউল না করতে।

দুই দলের খেলার ধরন যেন আয়নার এপার-ওপার। আর্জেন্টিনা বল পায়ে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেয়ার খেলায় বিশ্বাসী, মেসি সেই আক্রমণের মূল কারিগর, তার পাসিং আর গেম-রিডিং সামর্থ্যই দলের ছন্দের উৎস। মিসর উল্টো পথে হাঁটে। কমপ্যাক্ট রক্ষণ গড়ে প্রতিপক্ষকে সুযোগ দিতে না চাওয়া, তারপর দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে সালাহ ও ওমর মারমুশের গতি কাজে লাগানো। কেপ ভার্দে যেভাবে আর্জেন্টিনার ট্রানজিশনের দুর্বলতা কাজে লাগিয়েছিল, মিসরও নিশ্চয়ই সেই ছক থেকে সাহস সঞ্চয় করছে।

তাই আটলান্টায় মেসি ও সালাহ যতই আলো কাড়ুন, ম্যাচের কৌশলগত নকশায় ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াবে কেপ ভার্দে। কারণ বুবিস্তার দল এরই মধ্যে আর্জেন্টিনার দুর্বলতার মানচিত্র এঁকে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—স্কালোনি কি সেই পাঠ থেকে যথেষ্ট শিখেছেন, নাকি হোসাম হাসান কেপ ভার্দের খাতাটি খুলেই নতুন অঘটনের পরিকল্পনা সাজাবেন? বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে তাই শুধু মিসর নয়, নিজেদের শেখা পাঠও পরীক্ষায় বসাতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *