এমবাপ্পের পেনাল্টিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স
জুলাই ৫, ২০২৬
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা ইসলামী আন্দোলনের
জুলাই ৫, ২০২৬
এমবাপ্পের পেনাল্টিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স
জুলাই ৫, ২০২৬
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা ইসলামী আন্দোলনের
জুলাই ৫, ২০২৬

বিদায়েও বিস্ময় কেপ ভার্দে গোলিয়াথের রক্ষা, ডেভিডের গৌরব

মিয়ামির সবুজ গালিচায় যেন নতুন করে রচিত হচ্ছিল বাইবেলের মহাকাব্যিক উপাখ্যান—ডেভিড আর গোলিয়াথের অসম দ্বন্দ্ব। এক প্রান্তে জার্সিতে তিন তারকার অহং নিয়ে প্রবল পরাক্রমশালী আর্জেন্টিনা।

অন্য প্রান্তে আটলান্টিকের বুকে ভেসে থাকা মাত্র পাঁচ লাখ প্রাণের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। শক্তির অসম দ্বন্দ্বে ডেভিডের অদম্য সাহসের সামনে প্রায় নতজানু হয়ে পড়েছিল প্রবল পরাক্রমশালী গোলিয়াথ। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আর শেষ মুহূর্তের রোমহর্ষক নাটকীয়তায় ভর করে ৩-২ গোলের ঘর্মাক্ত জয়ে শেষ ষোলোর টিকিট হয়তো কেটেছে আলবিসেলেস্তেরা; কিন্তু মিয়ামির এ রাত ফুটবলের মহাকাব্যে চিরকাল খোদাই করা থাকবে হার না মানা ডেভিডের নামেই। যারা হেরে গিয়েও ছড়িয়েছে অবিস্মরণীয় মুগ্ধতার রেণু, যাদের একেকটি আক্রমণ আলবিসেলেস্তেদের শিরদাঁড়ায় বইয়ে দিয়েছিল ভয়ের হিমশীতল স্রোত। স্কোরলাইনের হিসাবনিকাশ তাই এখানে বড্ড রূঢ়। এ ম্যাচ আর্জেন্টিনার জন্য কেবলই লজ্জা থেকে বাঁচা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস; কিন্তু বিদায়বেলায়ও বিস্ময় ছড়ানো কেপ ভার্দের জন্য গৌরবের শোকগাথা।

এদিন আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে অভেদ্য প্রস্তরখণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভোজিনহা। চল্লিশ বসন্ত পেরিয়ে আসা এ গোলরক্ষক আটটি সেভে ফিরিয়ে দিয়েছেন আলবিসেলেস্তেদের নিশ্চিত গোলের উল্লাস। মেসির শট কিংবা জাদুকরী বাঁকানো ফ্রি-কিক, এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার শট কিংবা লাউতারো আর আলভারেজদের আগ্রাসী আক্রমণ সবকিছুই আছড়ে পড়েছে। আর ঠিক অন্য প্রান্তেই রণক্লান্ত এক যোদ্ধার বেশে প্রজ্বলিত ছিলেন হার না মানা লিওনেল মেসি। নিজে গোল করেছেন, সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, কর্নার থেকে জয়ের গোলের ভিত্তি গড়েছেন। দু চোখ আর শরীরী ভাষায় ছিল এক অনমনীয় জেদ, নিজের পায়ে হোক কিংবা নিখুঁত কোনো পাস কেপ ভার্দের এ দুর্ভেদ্য ‘ফ্যালানক্স’ ভেদ করতেই হবে। শেষ পর্যন্ত নিয়তি যেন ফিসফিস করে বলছিল, এই মহাকাব্যিক রাতের শেষ পঙ্‌ক্তিটি লিখবেন সেই জাদুকরই।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য চিরচেনা চিত্রনাট্য মেনেই হয়েছিল। ২৯ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পাস যখন অবিশ্বাস্য কোমল স্পর্শে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনলেন লিওনেল মেসি, তখন মনে হলো ম্যাচ হয়তো পুরনো ছন্দেই এগোচ্ছে। এক মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণ, আরেক মুহূর্তে বাম পায়ের নিখুঁত সমাপ্তি। ভোজিনহা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। মিয়ামি বিস্ফোরিত হলো উল্লাসে। এটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ২০তম গোল, টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোলের রেকর্ড, আর ২০২৬ আসরে সপ্তম গোল। এমন মুহূর্ত পৃথিবী বহুবার দেখেছে। মেসি দৌড়াচ্ছেন, দুই হাত প্রসারিত, সতীর্থদের আলিঙ্গনে হারিয়ে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছিল, এখান থেকেই শুরু হবে আর্জেন্টিনার সহজ জয়যাত্রা।

কিন্তু ডেভিডের হাতেও ছিল এক গুলতি—চল্লিশ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। তিনি পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগে খেলে বছরে যা রোজগার করেন, মেসি তার চেয়ে বেশি আয় করেন ইন্টার মায়ামির হয়ে মাত্র পাঁচ মিনিটে। ভোজিনহা যেন শুধু গোলরক্ষক নন, প্রতিরোধের প্রতীক। একের পর এক আর্জেন্টাইন আক্রমণ ফিরিয়ে দিতে শুরু করলেন। কখনো মেসির সামনে প্রাচীর হয়ে, কখনো এনজো ফার্নান্দেজের শট থামিয়ে, কখনো পুরো রক্ষণকে সাহস জুগিয়ে। অন্য প্রান্তে মেসিও একা লড়ছিলেন। আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রায় প্রতিটি বিপজ্জনক মুহূর্তের শুরু তার পা থেকেই। কখনো গভীরে নেমে বল বিলাচ্ছেন, কখনো ডান প্রান্তে সরে গিয়ে জায়গা তৈরি করছেন, কখনো এক স্পর্শে প্রতিরক্ষা চিরে দিচ্ছেন। সতীর্থদের অনেকেই যেখানে নিজেদের ছায়া, সেখানে ৩৯ বছর বয়সী মানুষটি যেন একাই বহন করছিলেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের আশা।

বিরতির পর বদলে গেল খেলার রঙ, বদলে গেল গল্পের ভরকেন্দ্র। ৫৯ মিনিটে মেন্দেসের বাড়ানো বলে দেরয় দুয়ার্তে সমতা ফেরালেন এমন নিখুঁত ফিনিশে যে মেসির গোলের পাশে রাখলেও বিরাগভাজন হবে না কেউ। জীবনে কখনো জাতীয় দলের জার্সিতে গোল না করা মিডফিল্ডার রায়ান মেন্দেসের পাস থেকে এমন এক শট নিলেন, যা শুধু জালে নয়, আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাসেও আঘাত করল। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন, মিয়ামির গর্জন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।

তারপর শুরু হলো ভোজিনহার রাত। মেসি আবার এলেন। একবার লাউতারো মার্তিনেজের পাসে, আরেকবার সরাসরি ফ্রি-কিকে, আবারো বক্সের ভেতর থেকে। প্রতিবারই সামনে দাঁড়িয়ে ভোজিনহা। কখনো বুক দিয়ে, কখনো দুই হাত বাড়িয়ে, কখনো বিদ্যুতের মতো ঝাঁপিয়ে।

অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আবার কেপ ভার্দের দুর্গে আঘাত হানে আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে মাথা ছুঁইয়ে দেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। সেই হেডেড পাস গিয়ে পড়ে বক্সের ডান পাশে থাকা লিসান্দ্রো মার্তিনেজের সামনে। এক মুহূর্তও দেরি করেননি তিনি। বাঁ পায়ের জোরালো শটে বল তুলে দেন জালের ওপরের ডান কোণে। স্কোরলাইন ২-১। আর্জেন্টিনা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। মনে হলো এবার শেষ। কিন্তু কেপ ভার্দে তখনো শেষ অধ্যায় লিখে শেষ করেনি। ১০৩ মিনিটে বলটি যখন সিডনি লোপেস কাবরালের পায়ে এল, খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিল পরের কয়েক সেকেন্ডে কী ঘটতে যাচ্ছে। বাম দিক থেকে ভেতরে ঢুকে শরীর সামান্য বাঁকিয়ে তিনি যে শটটি নিলেন, তা যেন কোনো জ্যোতির্বিদের হিসাব মেনে আঁকা এক নিখুঁত বক্ররেখা। বলটি উড়ে গিয়ে জড়িয়ে গেল দূরের ওপরের কোণে। মার্টিনেজের প্রসারিত হাতও সেখানে পৌঁছতে পারল না।

সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি আর আর্জেন্টিনার নেই। কিন্তু ফুটবল বিধাতার কলমে তখনো শেষ বাক্যটি লেখা বাকি ছিল। ১১১ মিনিটে কর্নার নিতে এগিয়ে গেলেন লিওনেল মেসি। ২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি যেন একাই বহন করছিলেন আর্জেন্টিনার আক্রমণ। ক্লান্ত শরীরেও বারবার ডেকে আনছিলেন অসম্ভবকে। তার বাঁ পা থেকে ভেসে আসা কর্নারটি ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর মাথায় লেগে ডাইনি বোর্হেসের গায়ে প্রতিফলিত হয়ে জালে ঢুকে পড়ল। স্কোরবোর্ডে লেখা হলো ৩-২। সেটি আত্মঘাতী গোল, নাকি রোমেরোর ইতিহাস হয়তো সেটি ফুটনোটে লিখে রাখবে। কিন্তু মূল পাঠে লেখা থাকবে, মেসির আরেকটি স্পর্শ আর্জেন্টিনাকে মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরিয়ে এনেছিল।

তবু হার মানতে নারাজ কেপ ভার্দে। সিডনি লোপেস কাবরাল আবারো দূরপাল্লার বজ্রপাত নামাতে চেয়েছিলেন। গিলসন বেঞ্চিমল আর জাইর সেমেদো সুযোগ খুঁজেছিলেন শেষ আক্রমণে। অতিরিক্ত সময়ে কেপ ভার্দে আরো তিনটি সুযোগ পেল, যার প্রতিটি গোলের মতোই বিপজ্জনক। এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে অসাধারণ সেভ করতে হয়েছে। শেষ হুইসেল বাজার আগে আর্জেন্টিনার রক্ষণ যেন ভেঙে পড়ার মতো। কিন্তু বাঁচল।

আর্জেন্টিনার সমর্থকরা শেষ ষোলোতে ওঠার আনন্দে উল্লাস করছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের চোখে-মুখেও ছিল কেপ ভার্দের প্রতি একরাশ মুগ্ধতা আর বিস্ময়। কেপ ভার্দে চলে গেল, কিন্তু তাদের গল্প থেকে গেল বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা অধ্যায় হয়ে। এক ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র, যারা হেরেও জিতে নিয়েছে বিশ্বের হৃদয়, আর এক গোলিয়াথ, যে টিকে গেল ঠিকই, কিন্তু নিজের দুর্বলতার আয়নাটাও দেখে ফেলল। কেপ ভার্দে বুঝিয়ে দেল বিশ্বকাপের মুকুট ধরে রাখতে হলে এর চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত হতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *