
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দিয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা
জুলাই ১, ২০২৬
একুয়েডরকে হারিয়ে ৪০ বছর পর শেষ ষোলোয় মেক্সিকো
জুলাই ১, ২০২৬২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট গতকাল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
টাকার অংকে এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। নতুন অর্থবছরের শুরুর দিন অর্থাৎ আজ থেকে এ বাজেট কার্যকর হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাব উত্থাপনের পর এর ওপর তিন সপ্তাহের আলোচনা এবং অর্থ বিলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর পর গতকাল কণ্ঠভোটে তা সংসদে পাস হয়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামে নতুন অর্থবছরের বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেন। বাজেট প্রস্তাবের ওপর সংসদ সদস্যরা গত তিন সপ্তাহ আলোচনা ও যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন। এটি দেশের ৫৫তম এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে গতকাল বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলে বাজেট পাসের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মন্ত্রীরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নির্বাহের যৌক্তিকতা তুলে ধরে মোট ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো সংসদে কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়।
মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা মোট ১ হাজার ৩৪২টি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং স্বতন্ত্র সদস্যসহ মোট ৪৩ জন সংসদ সদস্য ৩৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করে আলোচনায় অংশ নেন।
ছাঁটাই প্রস্তাবের আওতায় থাকা ৩৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়, অর্থ বিভাগ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, আইএমইডি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের উত্থাপিত ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গতকাল অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেন, ‘সরকারি ব্যয় ও প্রকল্প ব্যয়ের পারফরম্যান্স অডিট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করার জন্য এ বাজেট প্রদান করা হয়েছে। আর্থিক খাতে যে বিশৃঙ্খলা আছে বা হয়েছে তা বন্ধ করার জন্য সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’
বাজেট পাসের আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমাপনী বক্তব্যে জানান, সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন মতামত ও সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাজেট আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, স্বতন্ত্র ও বিরোধী দলের সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অর্থমন্ত্রী সরকারি ব্যয়ের অনুমোদন চেয়ে ২০২৬ সালের বরাদ্দ বিল (নির্দিষ্টকরণ বিল), ২০২৬ গতকাল সংসদে উত্থাপন করেন। এতে ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়। কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। এর আগে গত সোমবার ৬৮টি সংশোধনী এনে অর্থ বিল ২০২৬ পাস করা হয়।
সংসদে পাস হওয়া বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম এ বাজেটের আকার জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বড় অংকের এ বাজেটের বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আহরণের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আর অন্যান্য উৎস থেকে আহরণ করা হবে ৯১ হাজার কোটি টাকা।
এবার বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ঘাটতি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রাক্কলন করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া ঋণের মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে ব্যাংক খাত থেকে।
বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দের মোট পরিমাণ ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা ব্যয়ের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ।


