সাভারে পোশাক কারখানায় হঠাৎ অর্ধশত শ্রমিক অসুস্থ
জুলাই ১, ২০২৬
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস
জুলাই ১, ২০২৬
সাভারে পোশাক কারখানায় হঠাৎ অর্ধশত শ্রমিক অসুস্থ
জুলাই ১, ২০২৬
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস
জুলাই ১, ২০২৬

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দিয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা

 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অবস্থান অব্যাহত রেখে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আজ থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য এ মুদ্রানীতি প্রযোজ্য হবে।

নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এ খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ৫ শতাংশেরও কম। বেসরকারি খাতে বিরাজমান ঋণ প্রবৃদ্ধিকে ইতিহাসের সর্বনিম্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। এ সময় অন্য ডেপুটি গভর্নররাসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিরাজমান পরিস্থিতি ও আগামী দিনের ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, আগামী সময়ে অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থাজনিত মূল্যস্ফীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, ব্যাংক খাতের চাপ এবং বৈদেশিক খাতে ভারসাম্যহীনতা। এসব ঝুঁকি ও সংকট মোকাবেলায় সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির ওপরই ভরসা রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি মুদ্রানীতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা ও সংস্কার কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে এলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি পুনরায় বাড়বে।

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর মোস্তাকুর রহমানের এটি প্রথম মুদ্রানীতি। অনুষ্ঠানে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা ও ব্যাংক খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের জবাব দেন গভর্নর। গত চার বছর সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি ঘোষণা করার পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার বিষয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি একেবারেই কাজ করছে না, তা বলার সুযোগ নেই। আমাদের উদীয়মান অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মুদ্রানীতির সঙ্গে বাকি অন্য সূচকগুলোরও সামঞ্জস্যতা দরকার। শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এর পরও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অন্তত দুটি ক্ষেত্রে কাজ করেছে। মূল্যস্ফীতির যেভাবে উল্লম্ফন ঘটেছিল, সেটিকে আর বাড়তে না দিয়ে কমিয়ে আনা এবং বিনিময় হারের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও কাজ করেছে।’

খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ১৮ মাসের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘প্রথম ছয় মাসের একটা নীতির বিষয়ে এরই মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। পুনঃতফসিল নীতিকে উৎসাহিত না করে আমরা এক্সিট পলিসি সহজ করেছি। আর আগামী বছর দুটি আইন করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। অর্থঋণ আদালতের বিচার যেন ছয় মাসের মধ্যেই সম্পন্ন করা হয়—সরকারকে সে বিষয়ে অনুরোধ করব। এছাড়া ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট বা সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনও প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে তাদের টক্সিক অ্যাসেট (সংকটাপন্ন সম্পদ) ওই কোম্পানিগুলোর হাতে দিয়ে দিতে বাধ্য করা হবে। কারণ, এসব খারাপ ঋণ ব্যালান্স শিটে রাখলে তা ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। এছাড়া ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ভেতরে ভেতরে আরো অনেক কাজ করছি।’

যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি পালন করা হবে জানিয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং সুপারভিশন ডিপার্টমেন্টকে স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে যে যেকোনো ব্যত্যয়-বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। আগে হয়তো সর্বনিম্ন মাত্রার শাস্তি দেয়া হতো, কিন্তু এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রয়োগ করা হবে।’

মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপ সম্পর্কেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান তুলে ধরেন গভর্নর। একটি ব্যবসায়ী গ্রুপকে ৮ কোটি ডলার বিদেশী ঋণ গ্রহণের অনুমতি প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘২০২২ সালে মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশী ঋণের ব্যাপারে সতর্ক হয়েছিল। তবে এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। বাজারে এখন ঋণের সুদহার ১২ শতাংশের বেশি। কোনো উদ্যোক্তা যদি ৫-৬ শতাংশে বিদেশী ঋণ নিতে পারে, তাহলে আমরা তাদেরকে উৎসাহিত করব। ভবিষ্যতে বিদেশী ঋণকে আমরা আরো সহজ করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘আরেকটি গ্রুপের সম্ভবত প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার মতো দায় আছে। আমরা শীর্ষস্থানীয় তিনটি ব্যাংকের এমডিকে (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) ডেকে বিষয়টির সমাধান বের করতে বলেছি। ওনারা কিছু সমাধান বের করেছেন। আশা করি আগামী তিন মাসের মধ্যে এ সমাধানগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ওই গ্রুপ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসবে।’

ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনেক বেশি জল্পনা-কল্পনা করা হচ্ছে। আমি সবাইকে একটু ধৈর্য ধরে দেখতে বলব। আওয়ামী লীগের সময়ে ব্যাংকগুলোকে ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দিয়েছিল ৫১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গত চার মাসে ব্যাংক খাতে আমাদেরকে তেমন কোনো সহায়তা দিতে হয়নি। শুধু ইসলামী ব্যাংককে ১৩ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ব্যাংকিং কোম্পানি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা আইনের বাইরে কিছু করব না। আমার বিশ্বাস যে ইসলামী ব্যাংকের সমস্যা তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি নাজুক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি, কর্মসংস্থানের চাপ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রবৃদ্ধির গতি কমার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা জ্বালানি ও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি করছে, যা দেশের আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মুদ্রানীতি বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, গত কয়েক বছরের কঠোর মুদ্রানীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা কমেছে। চলতি বছরের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও ঝুঁকির কারণে ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফলে অতিরিক্ত তারল্যের একটি বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হচ্ছে।

অর্থনীতি সচল রাখতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মুদ্রানীতিতে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঋণ সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় শিল্প, কৃষি ও কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (সিএমএসএমই) খাতকে সহায়তা দেয়া হবে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে দেয়া হবে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্প উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

মুদ্রানীতিতে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, নমনীয় ও বাজারনির্ভর বিনিময় হার ব্যবস্থা বৈদেশিক খাতের সক্ষমতা বাড়াবে, রফতানি উৎসাহিত করবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

মুদ্রানীতিতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করতে বেশকিছু সংস্কার কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণ মোকাবেলায় কঠোর নিরীক্ষা, ঋণ আদায় কাঠামো উন্নয়ন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (রিস্ক বেসড সুপারভিশন) জোরদার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ডের (আইএফআরএস-৯) আওতায় প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি (এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস) কাঠামো চালু করা। এছাড়া ব্যাংকের মন্দ সম্পদ (খেলাপি ঋণ) ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন কাঠামো তৈরি এবং ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে আন্তঃব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে সমন্বিত পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া কথাও মুদ্রানীতিতে তুলে ধরা হয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *