জর্ডানের বিপক্ষে বেঞ্চে থাকছেন মেসি
জুন ২৭, ২০২৬
বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২
জুন ২৭, ২০২৬
জর্ডানের বিপক্ষে বেঞ্চে থাকছেন মেসি
জুন ২৭, ২০২৬
বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২
জুন ২৭, ২০২৬

নকআউটে ঝুঁকির কারণ হতে পারে মেসিনির্ভরতা গোল চাই আলভারেজ-মার্তিনেজদেরও

Argentina Zambia WCup Soccer

যে দলে জুলিয়ান আলভারেজ, লাওতারো মার্তিনেজ, নিকো পাজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা থিয়াগো আলমাদার মতো আক্রমণভাগের খেলোয়াড় আছেন, সেই দলে গোলের পুরো দায় একজন ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তির কাঁধে থাকা কি স্বস্তির?

২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুটা আর্জেন্টিনার জন্য প্রায় নিখুঁত। দুই ম্যাচে দুই জয়, গ্রুপসেরা নিশ্চিত, অধিনায়ক লিওনেল মেসির পাঁচ গোল—পরিসংখ্যানের খাতায় সবই যেন স্বপ্নের মতো। কিন্তু এ উজ্জ্বল ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। আর্জেন্টিনার হয়ে এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে গোল করেছেন শুধু একজন—লিওনেল মেসি।

যে দলে জুলিয়ান আলভারেজ, লাওতারো মার্তিনেজ, নিকো পাজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা থিয়াগো আলমাদার মতো আক্রমণভাগের খেলোয়াড় আছেন, সেই দলে গোলের পুরো দায় একজন ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তির কাঁধে থাকা কি স্বস্তির? গ্রুপ পর্বে বিষয়টি হয়তো খুব বড় সমস্যা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু নকআউট পর্বে প্রতিপক্ষের যত শক্তিশালী হবে, মেসির ওপর একক নির্ভরতা ততই আর্জেন্টিনার জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সাবেক সুইডিশ তারকা জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ সম্প্রতি বলেছিলেন, ‘মেসি শুধু আর্জেন্টিনার সেরা খেলোয়াড় নয়, সে-ই আর্জেন্টিনার পুরো সিস্টেম।’ কথাটি মোটেও বাড়িয়ে বলা নয়। লিওনেল স্কালোনির বর্তমান দলটি এমনভাবেই গড়ে উঠেছে, যেখানে মেসি শুধু গোল করেন না, আক্রমণের ছন্দ তৈরি করেন, সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস দেন এবং পুরো দলের মানসিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।

স্কালোনি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আর্জেন্টিনা নিজেদের খেলার ধরন বদলে ফেলেছে। আগে যেখানে মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা হতো, এখন সেটিকেই পরিকল্পনার অংশ বানানো হয়েছে। ফলও মিলেছে। টানা দুটি কোপা আমেরিকার শিরোপা, এরপর বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস—সবকিছুই এ দর্শনের সফলতার প্রমাণ। তাই আর্জেন্টিনায় এখন আর কেউ প্রশ্ন তোলে না, ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে ঘিরে দল গড়া ঠিক হচ্ছে কিনা।

তবে ফুটবলের বাস্তবতা নির্মম। একটি দল যতই শক্তিশালী হোক, নকআউট পর্বে একজন খেলোয়াড়কে আটকে দেওয়ার জন্য প্রতিপক্ষ বিশেষ পরিকল্পনা করবেই। যদি মেসিকে নিবিড় মার্কিংয়ের মধ্যে রাখা যায়, যদি তাকে বল কম দেয়া যায়, যদি তাকে বিশ্রাম নিতে হয় কিংবা সামান্য চোটও লাগে—তখন আর্জেন্টিনার বিকল্প পরিকল্পনা কী? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রথম সুযোগ হতে পারে জর্ডানের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচটি।

কাগজে-কলমে ম্যাচটির গুরুত্ব খুবই কম। আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। ফল যাই হোক, শেষ ৩২-এ প্রতিপক্ষ বদলাবে না। কিন্তু স্কালোনির কাছে এটি আসলে পরীক্ষার ম্যাচ। কারণ এখানেই দেখা যাবে, মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনা কতটা কার্যকরভাবে আক্রমণ সাজাতে পারে।

সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা, এ ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া হবে মেসিকে। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইন্টার মায়ামি জানিয়েছিল, তার বাঁ হ্যামস্ট্রিংয়ে পেশির ক্লান্তি রয়েছে। বয়সের কারণে টানা কয়েকটি উচ্চগতির ম্যাচ খেলানোও ঝুঁকিপূর্ণ। সামনে নকআউট পর্বে সম্ভাব্য পাঁচটি ম্যাচ। তাই স্কালোনি যদি অধিনায়ককে বেঞ্চে রাখেন, সেটি হবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

মেসির অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে নিকো পাজের দিকে। গত মৌসুমে কোমোতে খেলেই ইউরোপের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছেন এ মিডফিল্ডার। রিয়াল মাদ্রিদের মালিকানাধীন এই ফুটবলার মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন। সাম্প্রতিক ছোটখাটো চোট কাটিয়ে তিনি এখন আবার ফিট। জর্ডানের বিপক্ষে সুযোগ পেলে তাঁর জন্য এটি আত্মপ্রকাশের আদর্শ মঞ্চ হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় চাপ থাকবে দুই স্ট্রাইকার লাওতারো মার্তিনেজ ও জুলিয়ান আলভারেজের ওপর।

বিশ্বকাপের মঞ্চে লাওতারোর গল্পটি বেদনাদায়কই। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জিতলেও ব্যক্তিগতভাবে টুর্নামেন্টটি তার জন্য হতাশার ছিল। চোটের কারণে নিজের সেরা ছন্দে থাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত স্কালোনি তাকে বেঞ্চে বসিয়ে আলভারেজকে মূল একাদশে সুযোগ দেন। সেটিই ছিল আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সফল কৌশলগত পরিবর্তনগুলোর একটি।

লাওতারো অবশ্য সেই হতাশা ভুলে নতুন বিশ্বকাপে এসেছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, দুই ম্যাচ খেলেও এখনো গোলের দেখা পাননি। শুধু এ বিশ্বকাপ নয়, দুই আসরে আট ম্যাচ খেলেও তার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা এখনো শূন্য। একজন স্ট্রাইকারের জন্য এর চেয়ে বড় মানসিক চাপ আর কী হতে পারে?

জর্ডানের বিপক্ষে যদি তিনি গোল পান, নকআউটে যাওয়ার আগে সেটিই হতে পারে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

অন্যদিকে জুলিয়ান আলভারেজের পরিস্থিতিও সহজ নয়। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। মৌসুমের শেষদিকে গোড়ালির চোটও তাকে ভুগিয়েছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে কয়েকটি সুযোগ পেয়েও স্বাভাবিক ধারালো ফিনিশিং দেখা যায়নি। এমনকি মেসির দারুণ একটি থ্রু বলও কাজে লাগাতে পারেননি। সৌভাগ্য যে শেষ পর্যন্ত মেসি নিজেই গোল করে ম্যাচ নিশ্চিত করেছেন। এখানেই আর্জেন্টিনার উদ্বেগ।

নকআউটে বড় দলগুলো কখনোই মেসিকে এত সহজে জায়গা দেবে না। তাকে ডাবল কিংবা ট্রিপল মার্কিংয়ের মধ্যে রাখা হবে। ফলে অন্যদেরই সামনে এগিয়ে আসতে হবে। আসলে ‘মেসি-ডিপেনডেন্সিয়া’ বা ‘মেসিনির্ভরতা’ নতুন কোনো শব্দ নয়। বার্সেলোনার সময় থেকেই এটি প্রচলিত। তখনও অনেক ম্যাচে পুরো আক্রমণভাগের দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নিতেন মেসি। কিন্তু বর্তমান আর্জেন্টিনার জন্য বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখন তার বয়স ৩৯। প্রতিটি ম্যাচে একই মাত্রার দৌড়, চাপ ও দায়িত্ব বহন করা শারীরিকভাবে অসম্ভব।

স্কালোনির দল অবশ্য কেবল মেসিকে কেন্দ্র করেই চলে না। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো ডি পলরা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন। ডিফেন্সেও রয়েছে স্থিতিশীলতা। কিন্তু আক্রমণের শেষ স্পর্শে এখনো একজনের ওপরই অতিরিক্ত নির্ভরতা স্পষ্ট।

এ কারণেই জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচটি স্কোরলাইনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যদি মেসি ছাড়াও আর্জেন্টিনা তিন-চারটি গোল করতে পারে, যদি লাওতারো কিংবা আলভারেজ গোলের খাতা খুলতে পারেন, যদি নিকো পাজ নিজের সৃজনশীলতা দেখাতে পারেন, তাহলে স্কালোনি নকআউটে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হবেন।

অন্যদিকে যদি আবারো গোলের জন্য মেসিকেই ডাকতে হয়, তাহলে উদ্বেগ থেকেই যাবে। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা সফল হয়েছিল কারণ আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, ডি মারিয়া, এনজো ফার্নান্দেজ—সবাই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অবদান রেখেছিলেন। এই বিশ্বকাপেও সে গল্পের পুনরাবৃত্তি দরকার। মেসি হয়তো পথ দেখাবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিরোপা ধরে রাখতে হলে তার পাশে দাঁড়াতে হবে অন্যদেরও। নইলে প্রতিপক্ষের জন্য পরিকল্পনাটা খুব সহজ হয়ে যাবে—মেসিকে থামাও, আর্জেন্টিনাকে থামাও।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *