
লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ
জুন ২০, ২০২৬
সুইফট সুরক্ষায় যুক্ত হচ্ছে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টুলস
জুন ২০, ২০২৬
তিন মাস যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন।
ফলে এর প্রতীকী গুরুত্বও কম নয়। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এ সমঝোতায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে ইরান। চুক্তিটি তেহরানের আঞ্চলিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে। প্রতিবেশী অনেক রাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে সহাবস্থান ও সমন্বয়ের পথ খুঁজতে পারে। আর সে কারণেই ইসরায়েলসহ ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চুক্তির প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। গতকাল থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। এদিকে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডও। খবর রয়টার্স।
লেবাননের বিশ্লেষক সার্কিস নাউমের মতে, চুক্তিটি ওয়াশিংটন ও তেহরানের জন্য ‘গ্র্যান্ড বার্গেইন’। তার ভাষায়, ‘ইরান আর নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে পারছে না, অন্যদিকে ট্রাম্পও নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুভব করছেন না। ফলে উভয় পক্ষের জন্য সমঝোতাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হয়ে উঠেছে।’
তবে চুক্তিটি সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছে ইসরায়েলকে। দেশটির নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ইরানবিষয়ক গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এটিকে ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ‘যে অভিযানকে শুরুতে ইরানের ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল বা উৎখাতের প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত গিয়ে উল্টো তেহরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে।’
সিট্রিনোভিচ দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রধান কোনো দাবিই চুক্তিতে প্রতিফলিত হয়নি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তেহরান সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড সীমিত করার স্পষ্ট শর্ত নেই এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংসেরও কোনো রূপরেখা নেই। বরং যুদ্ধবিরতির কাঠামো লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক বিকল্পগুলোও সীমিত করে দিয়েছে। তার মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে রাজনৈতিক পর্যায়ে। বহু বছর ধরে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার যে কৌশল অনুসরণ করা হয়েছিল, এ চুক্তি সেই নীতির বিপরীত বার্তা দিচ্ছে। ওয়াশিংটন এখন তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে।
যুদ্ধের ফলাফলও ইরানের পক্ষে গেছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। চুক্তি কার্যকর থাকলে তেহরান যুদ্ধের অবসান, ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা, তেল রফতানি পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামোও আরো শক্তিশালী হলো বলে মনে করছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর সময় বলেছিল, তাদের লক্ষ্য ইরানের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেয়া এবং আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা। চুক্তির মাধ্যমে তার কোনোটিই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে এ সমঝোতা ইরানের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দলিল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
লেবাননেও চুক্তির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির আওতায় দেশটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে। যদিও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, লেবাননের পক্ষ হয়ে ইরান কোনো আলোচনা করতে পারে না এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো বৈরুতের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে হিজবুল্লাহঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো ভিন্ন মত দিচ্ছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা লেবাননের অবস্থানকে দুর্বল নয়, বরং শক্তিশালী করেছে। কারণ এখন লেবাননের প্রশ্ন বৃহত্তর আঞ্চলিক দরকষাকষির অংশ হয়ে উঠেছে। তাদের ধারণা, তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়েই নিজেদের মিত্রদের সমঝোতার দিকে ঠেলে দিতে সক্ষম হবে।
চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে। যুদ্ধের সময় ইরানের হামলা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। উপসাগরীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এ সমঝোতা তাদের কৌশলগত চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন আনছে। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর আগের মতো নির্ভর করা যাবে কিনা তা এখন আর নিশ্চিত নয়। একই সঙ্গে ইরানকে স্থায়ী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মেনে নেয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। ফলে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে সহাবস্থান ও সমন্বয়ের পথ খুঁজতে হতে পারে অনেক দেশকে।
তবে সবাই এ উদ্বেগের সঙ্গে একমত নন। ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাটাঙ্কার মতে, এটি আত্মসমর্পণের চুক্তি নয়; বরং দীর্ঘদিনের ব্যর্থ চাপ প্রয়োগ নীতির পর সবচেয়ে কম ক্ষতিকর সমাধান। তার ভাষায়, ‘সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে পরাজিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল কয়েক দশকের জন্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়ত।’
তবে ভাটাঙ্কা সতর্ক করে বলেছেন, ‘আসল পরীক্ষা এখন শুরু। কারণ পারমাণবিক আলোচনা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে কঠিন দরকষাকষি এখনো বাকি।’
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে অনিশ্চয়তা যোগ করতে পারে ইসরায়েল। ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এগিয়ে চলা আলোচনাকে পুরোপুরি থামিয়ে দেয়ার ক্ষমতা হয়তো তেল আবিবের নেই, কিন্তু আঞ্চলিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলার সুযোগ তাদের রয়েছে।
একজন ইরানি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, যুদ্ধের পর ইসরায়েল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আরেকজন ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, তেহরান তার মিত্রদের পরিত্যাগ করেনি। বরং প্রয়োজন হলে আলোচনার টেবিল ছেড়ে আবার সংঘাতে ফেরার ঝুঁকিও নিতে প্রস্তুত ছিল।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা শুধু যুদ্ধবিরতি নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে সাজানোর সূচনা বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নতুন বাস্তবতা কতটা স্থায়ী হবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।


