
দুর্গম চিম্বুলুই সীমান্তে অসুস্থ বিজিবি সদস্যকে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম সিএমএইচে স্থানান্তর
জুন ৬, ২০২৬
সাপ্তাহিক পুঁজিবাজার লেনদেন বেড়েছে ৪৫%, বাজারে ফিরছে ইতিবাচক গতি
জুন ৬, ২০২৬প্রতিবছর কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ চামড়া ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটে। অথচ চামড়াজাতপণ্য প্রস্তুতের জন্য প্রতিবছর উচ্চমূল্যে চামড়া আমদানি করতে হয়।
ঈদুল আজহায় কোরবানি করা ছাগল ও খাসির ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ও গরুর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহই করা হয় না বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, যেসব চামড়া সংগ্রহ করা হয় অদক্ষতার শ্রমিকদের কারণে তার অর্ধেকেই নষ্ট হয়ে যায়।
আজ শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত নীতি আলোচনায় এসব তথ্য জানানো হয়। ‘বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ কি ফিকে হয়ে আসছে?’ শিরোনামে আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বক্তারা বলেন, প্রতিবছর কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ চামড়া ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটে। অথচ চামড়াজাতপণ্য প্রস্তুতের জন্য প্রতিবছর উচ্চমূল্যে চামড়া আমদানি করতে হয়।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি টিপু সুলতান বলেন, এখন গরমের সময়। এমন আবহাওয়ায় বকরির চামড়া দুই ঘণ্টার মধ্যে সংরক্ষণ না করলে নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্য কোরবানির সময় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ করা হয় না।
তিনি বলেন, গরুর চামড়া ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় না। যেগুলো সংগ্রহ করা হয় তার মধ্যে ৫০ শতাংশের মতই নষ্ট হয়ে যাওয়া চামড়া। নষ্ট হয়ে যায় সংরক্ষণের অভাবে, অদক্ষ মানুষরা কোরবানির পশু থেকে চামড়া আলাদা করে। ফলে তাদের বাস্তব জ্ঞান না থাকায় এসব চামড়া নষ্ট হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে নেয়ার জন্য পরিবেশগত যেসব সুবিধা দেয়ার কথা ছিল তার কোনোটিই নয় বছরেও দেয়া হয়নি। ফলে ভালো ভালো বিদেশী ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চলে গিয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ঈদুল আজহায় খাসি ও ছাগলের ৬০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়েছে। এর একটি কারণ হল, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি নেয়া। হাজারীবাগে খাসি ও ছাগলের চামড়ার ৩০টি বিশেষায়িত প্লান্ট ছিল। গরু ও ছাগলের চামড়া প্রক্রিয়া এবং প্রক্রিয়ার মেশিনারিজ আলাদা। সাভারে মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পেরেছে আর বাকি ২৪টি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে গেছে। ফলে এত চামড়া সংগ্রহ করা কঠিন। আর অদক্ষ শ্রমিক-কসাই, ব্যক্তি উদ্যোগে যেসব চামড়া তোলা হয় সেখানে অনেক চামড়া নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলাম দুটি দাম নির্ধারণের জন্য। একটি হবে লবণযুক্ত আরেকটি হবে লবণ ছাড়া বা রক্তমাখা চামড়া। কিন্তু সেটি করা হয়নি। আগে ‘ঈদ অ্যাডভান্স’ নামে ৪৬০ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া যেত। ২০১৭ সালের পর থেকে এটি নামতে নামতে এবার ৬৫ কোটিতে এসেছে। ঋণ শোধ করতে না পেরে ৮০ শতাংশ ট্যানারি খেলাপি হয়ে গেছে। ২০ শতাংশ ট্যানারি কোনোরকমে টিকে আছে।
জেনি শু‘র চেয়ারম্যান নাসির খান বলেন, শিল্পটির অব্যবস্থাপনা ও নীতি সমস্যার কারণে দেশীয় চামড়াশিল্প বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং অনেক বিদেশি ক্রেতা বাজার ছেড়ে গেছে।
আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, একসময় দেশের চামড়াশিল্পে বড় সম্ভাবনা দেখা গেলেও তা এখন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ হলেও চামড়া খাতে তা ৯০ শতাংশের বেশি সম্ভব। কিন্তু এলডব্লিউজি সার্টিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের অভাবে রফতানি ১ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার মন্ডল বলেন, সংরক্ষণ ও সংরক্ষণ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হচ্ছে। তিনি আগামী এক বছরের মধ্যে চামড়ার অপচয় অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির উৎস চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বলেন, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের আরো সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। চামড়া খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কৃষি ব্যাংক পুনরায় অর্থায়ন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করবে বলেও জানান তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরো সমন্বিত ও বহুমাত্রিক চিন্তা প্রয়োজন। হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করা, কিন্তু দূষণের প্রভাব আজও বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী—উভয় নদীতেই বিদ্যমান। আমাদের একমাত্রিক উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সব সময় ভালো ফল বয়ে আনবে—এমনটি নাও হতে পারে। সেজন্য সববিষয় ভেবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আলোচনায় শিক্ষাবিদ, চামড়া শিল্পের প্রতিনিধি, ব্যাংকিং খাতের প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।


