প্রাক-বর্ষা জরিপের ফলাফল প্রকাশ ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭ ওয়ার্ড
জুন ৫, ২০২৬
সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী গতবারের চেয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার পশু বেশি কোরবানি হয়েছে
জুন ৫, ২০২৬
প্রাক-বর্ষা জরিপের ফলাফল প্রকাশ ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭ ওয়ার্ড
জুন ৫, ২০২৬
সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী গতবারের চেয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার পশু বেশি কোরবানি হয়েছে
জুন ৫, ২০২৬

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নই হোক অগ্রাধিকার

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণের নামে গত এক দশকে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৮ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬। সংখ্যার বিচারে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করতে পারছে? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাসবিহীন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটে ভুগছে। ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়নই এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি প্রদান নয়; বরং জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এখনও অনেক পিছিয়ে। বিশ্বের স্বীকৃত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান হতাশাজনক। সম্প্রতি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়ন সূচকগুলোতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। এর অন্যতম কারণ হলো গবেষণায় অপ্রতুল বিনিয়োগ, দুর্বল একাডেমিক পরিবেশ এবং প্রশাসনিক অনিয়ম।

গবেষণা ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারে না। অথচ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটেও গবেষণা খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত। শতাধিক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষককে নিয়ে পরিচালিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, বাস্তবে তার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। ফলে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং উদ্ভাবনী গবেষণায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে নতুন প্রতিষ্ঠিত অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ভাড়া করা ভবন বা অস্থায়ী স্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোথাও সরকারি বিদ্যালয়ের ভবন ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোথাও প্রশাসনিক অবকাঠামোও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসজীবনের পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গবেষণাগার, লাইব্রেরি, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাব শিক্ষার মানকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ অবস্থায় আরও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত বলে মনে হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা ও জনতুষ্টিমূলক নীতির প্রভাবও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় দাবি পূরণ বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ শিক্ষক এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ। এসব নিশ্চিত না করে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচ্চশিক্ষার গুণগত উন্নয়ন ঘটাতে পারে না।

বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের একটি বড় অংশ কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা দেশে ও বিদেশে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একটি বাস্তব উদাহরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক তরুণ সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে গিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের আয় সাধারণ শ্রমিকদের তুলনায় বেশি এবং তারা দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সক্ষম হচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে যে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণভিত্তিক শিক্ষা বর্তমান বিশ্বে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আসে। তবে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় অংশ এখনও অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিক। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তারা তুলনামূলক কম মজুরি পান। যদি সরকার কারিগরি শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণে আরও বেশি বিনিয়োগ করে, তাহলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি সম্ভব হবে এবং বৈদেশিক আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

এ কারণে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক কারিগরি বিদ্যালয় এবং জেলা পর্যায়ে নার্সিং ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, সেই অর্থ দিয়ে একাধিক কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করা সম্ভব। এসব প্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে কমছে। আগামী কয়েক দশকে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে। তাই ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই এখন উচ্চশিক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

সরকারের উচিত হবে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন করা, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং মানোন্নয়নই হওয়া উচিত জাতীয় অগ্রাধিকার।

সর্বোপরি বলা যায়, একটি দেশের উন্নয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং সেখান থেকে তৈরি হওয়া দক্ষ, সৃজনশীল ও গবেষণামুখী মানবসম্পদের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। তাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত উন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়াই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *