
আগামী বাজেটে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে শিক্ষাখাতে: শিক্ষামন্ত্রী
জুন ৪, ২০২৬
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে র্যাম্প ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে বাস
জুন ৫, ২০২৬বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশগত নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন বাংলাদেশের সাফল্যের গল্পকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছে। কিন্তু এই উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত সংকটও ক্রমশ গভীরতর হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, বায়ু ও পানি দূষণ, বনভূমি হ্রাস, নদী দখল এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এখন জাতীয় উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে দেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য। তারপরও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে এখানেই। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও খরার কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তার কৃষি, পানীয় জল এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। এসব বাস্তবতা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের পরিবেশ নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে জলবায়ু অভিযোজন এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামোকে স্থান দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
জলবায়ু অভিযোজন বলতে বোঝায় পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি কেবল একটি পরিবেশগত কৌশল নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার পূর্বশর্ত। উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বেড়িবাঁধ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস প্রযুক্তির উন্নয়ন অভিযোজন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে নগর এলাকাগুলোকে জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।
বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব অবকাঠামো ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে কি না। একটি সেতু, সড়ক, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা আবাসন প্রকল্প যদি আগামী ৩০ বা ৫০ বছরের জলবায়ু বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নেয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে একদিকে যেমন জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন বিনিয়োগও সুরক্ষিত থাকবে।
নগরায়ণ বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাস্তবতা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ পরিবেশগত ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। জলাভূমি ভরাট, খাল দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সবুজ এলাকার সংকোচন নগরগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহে জনদুর্ভোগ এবং বায়ুদূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। তাই পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা সংরক্ষণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আইনগত কাঠামোরও অভাব নেই। সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ থেকে শুরু করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জীববৈচিত্র্য আইন, জলবায়ু কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা এবং ডেল্টা প্ল্যান ২১০০—সবই পরিবেশ সুরক্ষার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রেই অব্যাহত রয়েছে। ফলে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন নয়, বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তিগতভাবে আরও সক্ষম করে তুলতে হবে। দূষণ পর্যবেক্ষণে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট তথ্য এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিবেশ সুরক্ষাকে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
তরুণ প্রজন্মও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিবেশ শিক্ষা, গবেষণা, সামাজিক বনায়ন, প্লাস্টিক বর্জন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিবেশ ক্লাব, জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা এবং সবুজ প্রযুক্তিতে উদ্ভাবন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রাকে টেকসই করতে হলে পরিবেশকে উন্নয়নের প্রতিপক্ষ নয়, বরং উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। নদী, বন, কৃষিজমি, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। তাই আগামী দশকের জন্য সরকারের পরিবেশ নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদী পুনরুদ্ধার এবং সবুজ নগরায়ণ।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের চেতনা আমাদের এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং ভবিষ্যতমুখী। কারণ একটি সবুজ ও সহনশীল বাংলাদেশই পারে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


