কোরবানির পশু কেমন হওয়া উচিৎ
মে ২৩, ২০২৬
বায়তুল মোকাররমে পাঁচ ঈদ জামাত, প্রথমটি সকাল ৭টায়
মে ২৪, ২০২৬
কোরবানির পশু কেমন হওয়া উচিৎ
মে ২৩, ২০২৬
বায়তুল মোকাররমে পাঁচ ঈদ জামাত, প্রথমটি সকাল ৭টায়
মে ২৪, ২০২৬

বন্ধ কারখানা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতি চাঙ্গা করার লক্ষ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা

বন্ধ কলকারখানা চালু করাসহ স্থবির অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বড় আকারের এ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা হবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। এ অর্থ আসবে তফসিলি ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে, যা থাকবে সরকারি গ্যারান্টির আওতায়। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে মনে করছে দেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম সম্মেলন কক্ষে গতকাল এ প্যাকেজ ঘোষণা করেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। বেলা আড়াইটায় শুরু হওয়া সংবাদ সম্মেলনে চার ডেপুটি গভর্নরসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রণোদনা প্যাকেজের ভিত্তি সুদহার হবে ১০ শতাংশ (নীতি সুদহার)। এর সঙ্গে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ৩ শতাংশ সুদ যুক্ত করে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এক্ষেত্রে ঋণের সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ। তবে এর মধ্যে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে পরিশোধ করবে। বাকি ৭ শতাংশ সুদ পরিশোধ করবে গ্রাহক। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের সুদহার হবে ৭ শতাংশ। প্রণোদনা প্যাকেজের ভর্তুকি হিসেবে সরকারকে বছরে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মো. মোস্তাকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের চতুর্দশ গভর্নর হিসেবে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন। এ পদে যোগদানের পর প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দিতে গতকালই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আসেন তিনি। এ সময় তিনি দেশের অর্থনীতির বিরাজমান পরিস্থিতি, প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার প্রেক্ষাপট এবং এর বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। ‘প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট, এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন অ্যান্ড ইকোনমিক রিভাইভাল’ শীর্ষক এ প্যাকেজের মূল লক্ষ্য হলো দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। এতে বন্ধ শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালু; নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি; কৃষি ও রফতানি খাতকে আরো শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ বাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, অর্থ পাচার ও আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদহার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত করছে।

শিল্প খাতে বিরাজমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদনমুখী বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন কমেছে কিংবা অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল রফতানি চাহিদা ও বাড়তে থাকা বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ঘোষিত প্রণোদনা ‘কাউন্টার-সাইক্লিক্যাল’ ভূমিকা পালন করবে।

৬০ হাজার কোটি টাকার এ প্যাকেজকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সবচেয়ে বড় অংশ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিকের মজুরি, ইউটিলিটি বিল, রফতানি আদেশ বাস্তবায়ন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে। এ খাতে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র, কুটির, মাঝারি ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো প্যাকেজের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ। এ খাতে নয় লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় নির্বাহে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে। রফতানি বহুমুখীকরণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। এর মাধ্যমে পণ্য ও সেবার নতুন রফতানি বাজার তৈরির উদ্যোগ নেয়া হবে। এ খাতে ৫০ হাজার কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে আলাদা ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানির জন্য এ অর্থ ব্যবহার করা হবে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে আরো এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। প্যাকেজের আওতায় ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের পুরোটাই বিতরণ হবে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ১০টি খাতভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্সিং খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থ বিতরণ করা হবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য আরো ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মাধ্যমে। ধুঁকতে থাকা চামড়াজাত পণ্য ও জুতা রফতানি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রফতানির জন্যও ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে।

বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ বিতরণের দায়িত্বে থাকবে কর্মসংস্থান ব্যাংক। আর বিদেশগামী কর্মীদের জন্য বরাদ্দকৃত ১ হাজার কোটি টাকা তহবিল বিতরণের দায়িত্ব পড়েছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ওপর। এছাড়া আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১ হাজার কোটি, পরিবেশবান্ধব পণ্যে ১ হাজার কোটি ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠা স্টার্টআপ খাতও ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ পেয়েছে। সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশে ব্যবহৃত ৫০০ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে বলে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন।

গভর্নর বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাত থেকে ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। ভদ্রভাবে এটাকে খেলাপি বলা হয়। আসলে এটা খেলাপি না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ঋণের বিপরীতে জামানত, প্রপার ডকুমেন্ট নেই। চুরির এসব টাকা পাচার হয়ে গেছে। এসব অর্থ ফেরত আনা অনেক সময়সাপেক্ষ। অর্থ ফেরত আনতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ও রফতানি বাড়ানো আমাদের লক্ষ্য। ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *