
দেশের আমদানি-রফতানি দুই খাতেই মন্দা
মে ৪, ২০২৬
৩ জনের মৃত্যু, কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ আটলান্টিকে ক্রুজ জাহাজে ‘বিরল হান্টাভাইরাসের’ প্রাদুর্ভাব
মে ৪, ২০২৬লজিস্টিক খরচ কম, বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের তুলনায় দ্রুত সরবরাহ পাওয়া যায়—এমন সুবিধার কারণে ভারত থেকে কৃষিজাত পণ্য আমদানি বাড়ছে বাংলাদেশে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিবেশী দেশটি থেকে আনা হয়েছে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য, যা কিনা মোট আমদানি ব্যয়ের ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ। ভারত থেকে মূলত খাদ্যশস্য, মসলা ও বিভিন্ন নিত্যপণ্য নিয়মিত আমদানি করা হয়। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে দেশটির সরকারি হিসাব বলছে, খরচের হিসাবে কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ রফতানি হয়েছে মহিষের মাংস। এর পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে নন-বাসমতী চাল আমদানিতে।
খাতসংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, দেশে গরু ও মহিষসহ অন্যান্য মাংস আমদানিতে অনুমতি দেয়া হয় না। কেবল পাঁচ তারকা হোটেলের জন্য সীমিত পরিসরে প্রিমিয়াম ফ্রোজেন মাংস আমদানির সুযোগ রয়েছে। তবে ওই মাংস আনতে এত ব্যয় হওয়ার কথা নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরও জানিয়েছে, দেশে মাংস আমদানির অনুমোদন নেই।
ভারতে মাংস রফতানির সব ধরনের ছাড়পত্র দিয়ে থাকে দেশটির বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এপিইডিএ)। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ব্যয়ের হিসাবে সর্বোচ্চ আমদানি হয়েছে মহিষের মাংস, প্রায় ৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের। কৃষিপণ্যের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানি হয়েছে ৩৫ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের নন-বাসমতী চাল। এছাড়া মসলা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩২ কোটি ৬ লাখ ডলার, ফুল ও শোভাময় গাছপালাসংক্রান্ত বাণিজ্যিক পণ্য ২১ কোটি ৭৮ লাখ এবং পেঁয়াজ আমদানিতে ২০ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো বাংলাদেশের সরকারি নথিতে মহিষের মাংস আমদানির কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (আইআইটি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাংস আমদানির এনওসি (পূর্বানুমতি বা অনাপত্তি সনদ) দেয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোনো এনওসি দেয় না। তবে আমি যতটুকু জানি মাংস আমদানির অনুমতি নেই।’
সরকারের ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪’-এ বলা হয়েছে—গরু, ছাগল, মুরগির মাংস ও মানুষের খাওয়ার উপযোগী অন্যান্য পশুর মাংস আমদানির ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, তারা কোনো ধরনের মাংস আমদানির জন্য এনওসি দিচ্ছেন না।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ট্রেড শাখার পরিচালক ডা. মো. বয়জার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা কোনো ধরনের মাংসের অনুমতি দিই না। তবে পাঁচ তারকা হোটেল বা এ রকম জায়গায় সামান্য পরিমাণে স্পেশাল কোয়ালিটির মাংসের কিছু অনুমতি আছে। উদাহরণস্বরূপ গরুর সিরলিয়ন ক্যাটাগরির মাংস দেশীয় একটি কোম্পানিই ৫ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি করে। এমন স্পেশাল কিছুর অনুমতি আছে। তবে সেটি মাংস হিসেবে না, স্পেশাল ক্যাটাগরির খাদ্য হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়। তাছাড়া মাংস আমদানির অনুমতি নেই।’
ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হিসাবে প্রায় ৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের মহিষের মাংস আমদানির তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মো. বয়জার রহমান জানান, এমন কোনো তথ্য বর্তমানে তার কাছে নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে বলেও জানান তিনি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাবেক এক মহাপরিচালকের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা হয়। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে তিনি জানান, আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪ অনুযায়ী, যেকোনো মাংস আমদানিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। তবে অধিদপ্তর মাংস আমদানিতে অনুমতি দেয় না। এটি দীর্ঘদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে। দেশে উৎপাদিত পশু দিয়েই মাংসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। সে জন্য আমদানির অনুমোদন দেয়া হয় না। সে নীতিটি এখনো কার্যকর রয়েছে বলেও জানান তিনি।
দেশের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মাংসের চাহিদা ছিল ৭৭ লাখ ৯২ হাজার টন। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৮৯ লাখ ৫৪ হাজার টন। উদ্বৃত্ত রয়েছে ১১ লাখ ৬২ হাজার টন।
সংস্থাটির তথ্যমতে, বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে মহিষের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মহিষের সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৩২ হাজার। আগের অর্থবছরে ছিল ১৫ লাখ ২৪ হাজারটি। আর তারও আগের অর্থবছর ২০২২-২৩-এ দেশে মহিষের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ১৬ হাজার।
ঈদুল আজহা উদযাপন উপলক্ষে কোরবানির পশুর চাহিদা নিরূপণ ও সরবরাহ বিষয়ে জানাতে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে মন্ত্রণালয়টির মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, এ বছরের ঈদে সম্ভাব্য চাহিদার বিপরীতে প্রায় ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
মন্ত্রী বলেন, এ বছর কোরবানির জন্য দেশে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। বিপরীতে দেশে প্রাপ্যতা রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। সে হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এবার কোরবানিযোগ্য গরু ও মহিষের সংখ্যা ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮।
ভারত থেকে পরিচালিত কৃষির অনলাইন বাজারভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম ট্রেডোলজি ডটকমে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত ‘ভারত থেকে বাংলাদেশে কৃষিপণ্য রফতানি: বাজারের আকার, চাহিদা ও সুযোগ (২০২৬ গাইড)’ শীর্ষক বিশ্লেষণেও মহিষের মাংস আমদানির বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ প্রবর্ষ শর্মার বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারত থেকে বাংলাদেশে কোন কৃষিপণ্য রফতানি করা যায়—এটা ভাবছেন? এর উত্তর হচ্ছে—মাংস ও মৌলিক শস্য (গ্রেইন)। এগুলো বিপুল পরিমাণে বিক্রি হয় এবং প্রতিদিন প্রতিবেশী দেশটিতে পাঠানো হয়।
প্রবর্ষ শর্মা তার লেখায় দুই দেশের দামের পার্থক্যটিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারতে প্রতি টন মাংসের দাম আড়াই-তিন হাজার ডলার। বাংলাদেশে যেটি সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার ডলার। যেটি থেকে উচ্চ মার্জিন আসে। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে মাংস রফতানি লাভজনক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ পশু পালনে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছে। নিজস্ব উৎপাদন দিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকছে। সেখানে মাংস আমদানি দেশীয় খামারি ও কৃষকদের আরো লোকসানে ফেলছে বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হোটেল-রেস্তোরাঁর জন্য সীমিত পরিসরে মহিষের মাংস আমদানির সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু সেটিকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত আমদানি করা হচ্ছে হয়তো। সেজন্যই হয়তো এত পরিমাণ আমদানির (এপিইডিএর হিসাব) তথ্য দেখানো হয়েছে।’
দেশে যে পরিমাণ মাংস উৎপাদন হয়, সেটি দিয়েই চাহিদা মেটানো যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘কোরবানির সময় পশু অবিক্রীতও থাকছে। সেখানে আমদানি করা হলে দেশী খামারি ও কৃষকরা আরো বেশি লোকসানে পড়বেন। তাই মাংস আমদানি অনুমোদন না দেয়ার যে নীতি, সেটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার।’


